শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের শুভ্রতা, শিউলির সুবাস আর ঢাকের শব্দে বাংলার প্রকৃতি যখন দুর্গোৎসবের আনন্দে মুখর, তখন মহাষ্টমী নিয়ে আসে ভক্তি, শক্তি ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ বার্তা। শারদীয় দুর্গাপূজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই দিনটি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হলেও এর তাৎপর্য কেবল পূজামণ্ডপে সীমাবদ্ধ নয়। অশুভের বিরুদ্ধে শুভের সংগ্রাম, নারীর মর্যাদা, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার যে শিক্ষা মহাষ্টমী দেয়, তা সমকালীন সমাজের জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে সমাজ মহাষ্টমীতে দেবীকে শক্তিরূপে পূজা করে, সেই সমাজেই নারী কেন নির্যাতিত হন? যে পূজায় অসুরবিনাশের প্রার্থনা করা হয়, সেখানে দুর্নীতি, অন্যায়, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কতটা দৃঢ়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্যেই মহাষ্টমীর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেন। দেবীর চামুণ্ডারূপে চণ্ড ও মুণ্ড বধের কাহিনি সেই সংগ্রামেরই প্রতীক। পুরাণের এই আখ্যানকে কেবল অতীতের অলৌকিক ঘটনা হিসেবে দেখলে এর সামাজিক শিক্ষা অধরা থেকে যায়। বরং এর মধ্যে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস খুঁজে নিতে হবে।আজকের সমাজে চণ্ড-মুণ্ডের প্রতীকী রূপ হতে পারে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নারী নির্যাতন, দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ এবং ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করা। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছাড়া ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। অন্যায়কারী যত ক্ষমতাবানই হোক, তার অন্যায়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই ন্যায়ভিত্তিক সমাজের শর্ত।মহাষ্টমী তাই শুধু অশুভের বিনাশ কামনার দিন নয়; নিজের ভেতরের লোভ, হিংসা, অহংকার ও অসহিষ্ণুতাকে চিহ্নিত করারও দিন। অন্যের অন্যায় দেখেও নীরব থাকা, সুবিধার জন্য সত্য এড়িয়ে যাওয়া কিংবা দুর্বল মানুষের প্রতি অবিচার মেনে নেওয়া—এসব প্রবণতা থেকে মুক্ত না হলে দেবীবন্দনার সামাজিক অর্থ পূর্ণতা পায় না।মহাষ্টমীর অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ আচার কুমারী পূজা। এই পূজায় একটি কন্যাশিশুকে দেবীর প্রতীক হিসেবে আরাধনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা এবং নারীর মধ্যে দেবীত্ব উপলব্ধির ভাবনা প্রকাশ পায়। স্বামী বিবেকানন্দ ১৯০১ সালে বেলুড় মঠে কুমারী পূজার আয়োজন করেছিলেন, যা এই রীতির আধুনিক পুনঃপ্রচারে বিশেষভাবে স্মরণীয়।তবে কুমারী পূজার প্রকৃত শিক্ষা নিয়ে আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। পূজার দিন একটি কন্যাশিশুর পায়ে ফুল দিয়ে প্রণাম করলাম, অথচ অন্য সময়ে মেয়েশিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে অবহেলা করলাম—এ কেমন শ্রদ্ধা? নারীকে দেবী বলে সম্বোধন করেও যদি তাঁর প্রতি অসম্মান, নির্যাতন ও বৈষম্য চলতে থাকে, তাহলে সেই আরাধনা সামাজিক বাস্তবতায় অর্থহীন হয়ে পড়ে।নারীর মর্যাদা রক্ষার অর্থ তাঁকে শুধু মাতৃত্ব বা পবিত্রতার প্রতীকে সীমাবদ্ধ রাখা নয়। নারী একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে, নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেওয়াই নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধার বাস্তব প্রকাশ।মহাষ্টমীর শিক্ষা তখনই সার্থক হবে, যখন কুমারী পূজার মণ্ডপ থেকে নারীর প্রতি সম্মান ঘরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে।অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। প্রচলিত শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, এই সন্ধিক্ষণ ৪৮ মিনিটের। চণ্ড ও মুণ্ডের বিনাশের পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে যুক্ত এই পূজা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামের প্রতীক।জীবনের ক্ষেত্রেও এমন সন্ধিক্ষণ আসে, যখন মানুষকে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায় কিংবা সাহস ও ভীরুতার মধ্যে একটি পথ বেছে নিতে হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা সহজ; কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন দৃঢ়তা ও নৈতিক সাহস।সমাজের সংকটও একদিনে তৈরি হয় না। অন্যায়ের প্রতিবাদ বন্ধ হলে, অপরাধী প্রশ্রয় পেলে এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নিজেদের কর্তব্য এড়িয়ে গেলে সংকট গভীর হয়। তাই সন্ধিপূজার তাৎপর্য শুধু নির্দিষ্ট সময়ে প্রদীপ জ্বালানো বা মন্ত্র উচ্চারণে নয়; সংকটের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলাতেও।বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরে মহাষ্টমী উপলক্ষে পূজামণ্ডপে ভক্তদের সমাগম ঘটে। অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। অনেক স্থানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষও এই আনন্দে অংশ নেন। তাঁদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের একটি ইতিবাচক দিক।তবে সম্প্রীতির কথা শুধু উৎসবের সময় বললে চলবে না। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার এবং মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে সারা বছর একই দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ যেন পরিচয়ের কারণে ভয়, বৈষম্য বা হামলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।পূজামণ্ডপে অন্য ধর্মের মানুষের উপস্থিতি সম্প্রীতির সুন্দর প্রকাশ হতে পারে; কিন্তু সম্প্রীতির প্রকৃত পরীক্ষা হয় সংকটের সময়। প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে হেয় না করা, গুজব ও বিদ্বেষমূলক প্রচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং অন্যের ধর্ম পালনের অধিকারকে সম্মান করাই প্রকৃত সামাজিক সম্প্রীতি।ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমায়। মহাষ্টমী আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।দুর্গোৎসবের আনন্দের পাশাপাশি সমাজের অসহায় মানুষের কথাও ভাবতে হবে। যাঁদের ঘরে খাবার নেই, যাঁরা চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন কিংবা যাঁদের সন্তান অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, তাঁদের দুর্দশা উপেক্ষা করে উৎসবের জাঁকজমক নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার সুযোগ নেই।পূজার প্রসাদ ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে তুলে দেওয়া, দরিদ্র শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা কিংবা বিপদগ্রস্ত পরিবারের খোঁজ নেওয়া—এসব কাজ ধর্মীয় মূল্যবোধকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে। মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন ছাড়া ধর্মীয় আচারও তার পূর্ণ সামাজিক অর্থ পায় না।মহাষ্টমী আমাদের শেখায়, শক্তি মানে শুধু শত্রুকে পরাজিত করা নয়; দুর্বলকে রক্ষা করার সামর্থ্যও শক্তির পরিচয়। শুদ্ধতা মানে শুধু বাহ্যিক আচার নয়; চিন্তা, আচরণ ও কাজে সততা বজায় রাখাও শুদ্ধতার অংশ। আর সম্প্রীতি মানে শুধু পাশাপাশি বসে উৎসব উপভোগ করা নয়; ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করাও সম্প্রীতির শর্ত।মহাষ্টমীর দিন দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে আমরা অন্যায়ের বিনাশ চাই। কিন্তু নিজের জীবনে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে সেই প্রার্থনার সঙ্গে আমাদের আচরণের বিরোধ তৈরি হয়। নারীর প্রতি সম্মান কামনা করি, অথচ নারীর মতামতকে অবজ্ঞা করি। সম্প্রীতির কথা বলি, অথচ ভিন্ন ধর্মের মানুষের অধিকার রক্ষায় নীরব থাকি। মানবসেবার কথা বলি, অথচ অসহায় মানুষের কষ্ট এড়িয়ে যাই।এই দ্বিচারিতা থেকে বেরিয়ে আসাই মহাষ্টমীর বড় শিক্ষা। ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয় হলেও ন্যায়, সততা, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের সামাজিক মূল্য সর্বজনীন। তাই মহাষ্টমীর তাৎপর্যকে জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হলে কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকতে হবে।দুর্গাপূজার আলোকসজ্জা একসময় নিভে যাবে, ঢাকের শব্দ থেমে যাবে, পূজামণ্ডপের ভিড়ও কমে আসবে। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নারীর মর্যাদা রক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব শেষ হবে না।মহাষ্টমীর প্রকৃত জয় সেদিনই হবে, যেদিন নারীকে সম্মান জানাতে আলাদা পূজার প্রয়োজন হবে না, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষকে একা থাকতে হবে না। দেবীর কাছে অশুভ বিনাশের প্রার্থনা করার পাশাপাশি সমাজের অশুভ প্রবণতাগুলো দূর করার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে। কারণ, দেবীবন্দনার সার্থকতা শুধু মন্ত্রে নয়, মানুষের প্রতি আমাদের আচরণেও প্রমাণিত হয়।
লেখক: সংবাদকর্মী ও কলামিস্ট
১ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ২৪ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৩৫ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ১৮ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৪৪ মিনিট আগে