|
Date: 2023-04-28 15:33:50 |
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গত কয়েকদিন ধরে টানা তাপদাহে বিপন্ন হয়ে পড়ছে জনজীবন। এর প্রচণ্ড প্রভাব পড়েছে উপজেলার চা বাগানগুলোতেও। তীব্র তাপদাহে পুড়ছে বিভিন্ন চা বাগান। তাপে ঝলসে যাচ্ছে গাছের কচি পাতা, বিশাল সবুজের সমারোহ এখন কালচে লাল। কুঁকড়ে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে কুঁড়ি। টানা গরমের প্রভাব ও বৃষ্টি না হওয়ায় কমে এসেছে উৎপাদন। এ অবস্থায় চায়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে ইরিগেশনের পাশাপাশি প্রতি চার গাছের মধ্যে মাটি গর্ত করে পঁচা গোবরের সাথে কিছু টিএসপি মিশিয়ে আবার মাটিতে মিলিয়ে দেয়ার পরামর্শ চা বিজ্ঞানীদের।
বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্রর পরিচালক ড. ইসমাইল হোসেন জানান, চায়ের জন্য ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা উত্তম। তবে সর্বোচ্চ ২৯ ডিগ্রী পর্যন্ত চা গাছ তাপ সহ্য করতে পারে। এর উপরে গেলেই খরায় পড়বে চা। চা পাতায় দেখা দিবে বাঞ্জি দশা। তবে চা বাগানে প্রতি ২০ ফিট অন্তর অন্তর সেড ট্রি থাকলে তা ৩৫-৩৬ ডিগ্রী পর্যন্ত সহনীয়। তিনি আরও বলেন, সূর্যালোকের উপস্থিতিতে গাছের পাতায় অবস্থিত ক্লোরফিলের মাধ্যমে গাছ যেভাবে পানি বা রস আহরণ করে, তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রী পাড় হলেই এই স্বক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বাতাস থেকে কার্বনডাই অক্সাইডের মাধ্যমে যে গ্লোকুজ বা সরকরা জাতীয় খাদ্য উৎপাদন করে অতিরিক্ত সূর্যালোকের কারনে সেটাও বাঁধাগ্রস্ত হয়।
বর্তমানে মৌলভীবাজারের তাপমাত্রা রেকর্ড হচ্ছে ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রী। যার সকল মাত্রা অতিক্রম করেছে। এ অবস্থায় থেমে গেছে চায়ের পাতা বৃদ্ধি। যাকে চা বাগানের ভাষায় বলে বাঞ্জি দশা।
শুক্রবার ২৮ এপ্রিল সকালে সরেজমিন গিয়ে ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানের কর্মরত শ্রমিক সারথী দেশওয়ারার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৃষ্টি না থাকার কারণে এই সময়ে সারা দিনে মাত্র ১০-২০ কেজি পর্যন্ত চা পাতা তুলতে পারছি। অথচ বৃষ্টি থাকলে আমরা এসময়ে সারা দিনে ৩০ থেকে ৪০ কেজি পাতা তুলতে পেরেছি। এতে তাদের দৈনিক ১৭০ টাকা হাজিরা (বেতন) জন্য যে ২৪ কেজি পাতা বাধ্যতামুলক তুলতে হয় তাও পুরণ হচ্ছে না। ভানুগাছ রোডের ১০ ও ১১ নম্বর সেকসনের বাগান সরদার কান্তা ভর জানান, প্রচন্ড রোদে সারাদিন কাজ করেও তাদের শ্রমিকরা মিলাতে পারছেন না হাজিরা। ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির কোষাধ্যক্ষ মহিস রিকিয়াশন বলেন, বৃষ্টি না থাকার কারণে চা বাগানগুলো পড়ে গেছে, অনেক চা পাতার রং নষ্ট হয়ে গেছে। সকালে বিকেলে অনেক চা বাগানে কলস দিয়েও প্রচুর পানি দিয়েছি, আবার মেশিন কম থাকার কারণে বাগানে পানি কভার দেওয়া সম্ভব হয় না।
বিভিন্ন চা বাগান সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন সেকশনে মাঝে মাঝে একটা দুইটা করে গাছ মরে গেছে। নতুন আসা কুঁড়ি গুলো কোথাও এক সাপ্তাহ ধরে একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে। কোথাও কোথাও কুঁড়িগুলো হলুদ রং ধরেছে। কোথাও আবার পাতা ঝিমিয়ে পড়েছে। সহসা চায়ের জন্য পরিমিত বৃষ্টি না পেলে দেখা দিতে পারে উৎপাদন ঘাটতি। তবে এ থকে স্থায়ী সমাধানের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গ্রহনের পরামর্শও চা বিজ্ঞানীদের। এ অবস্থায় বাংলাদেশ চা গবেষনা কেন্দ্রের চা বিজ্ঞানী ও প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের উনয়ণ কর্মকর্তারা বাগানে বাগানে গিয়ে চা গাছকে রক্ষা করতে দিচ্ছেন নানা পরামর্শ। তারা বলেন, এই মৌসুমের শুরুর দিকে পরিমিত বৃষ্টিপাত হওয়ায় অনেকে নতুন সেকশন শুরু করেছেন। বিশেষ করে চলমান খরায় এই ইয়াং টি গুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। তবে এ গুলোকে বাঁচানোর জন্য ৪টি গাছের মধ্যে আড়াই কেজি গোবরের সাথে ৪০-৫০ গ্রাম টিএসপি একত্রে মিশিয়ে মাটি গর্ত করে মিলিয়ে দিতে হবে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউট এর পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, দীর্ঘসময় ধরে প্রচণ্ড খরায় অধিকাংশ চা বাগান গাছ মরে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবে কিছুদিন আগে সামান্য বৃষ্টিপাত হওয়ায় কিছুটা রিকভার হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন ক্ষতিগ্রস্ত চা বাগানগুলোর লোকসান কাটিয়ে ওঠতে গেলে প্রচুর বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন।
© Deshchitro 2024