হিজড়ারাও এ সমাজের লোক,তাদেরও বেঁচে থাকার ও জীবন জীবিকা নির্বাহের অধিকার রয়েছে কিন্তু হিজড়ারা কেন সামাজিক অস্বস্তিজনক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছে?  অনুসন্ধান করলে তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দু’ধরনের কারণই বের হয়ে আসে। বেঁচে থাকাই যেখানে দুঃসাধ্য সেখানে নিয়মের অনিয়ম হবে এটাই স্বাভাবিক। কোন মানুষই অপরাধী হয়ে পৃথিবীতে জন্মায় না। পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং সামাজিক বাস্তবতা মানুষকে অপরাধের দিকে ধাবিত করে থাকে। হিজড়ারাও তার ব্যতিক্রম নয়! 


 সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে হিজড়াদের নানামুখী সমাজবিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত হতে হচ্ছে। কারণ, বেঁচে থাকাই যেখানে মুখ্য বিষয় অন্যান্য কিছু সেখানে গৌণ। তাদের জন্য সামাজিকভাবে কোন কাজের ব্যবস্থা হচ্ছে না। তাহলে তারা কিভাবে টিকে থাকবে? টিকে থাকার তাগিদেই হিজড়াদেরকে জনজীবনে অস্বস্তিমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। সুতরাং হিজড়াদের জীবনাচরণ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে সামাজিকভাবে গবেষণা করার বিশদ প্রয়োজন রয়েছে। যদি কোনভাবে তাদেরকে যথাযথভাবে পুনর্বাসন করা যায়, তাহলে হিজড়াদেরকেও উন্নয়নশীল কর্মকাণ্ডের সাথে সংযুক্ত করা যাবে। কেননা, তারা তো ইচ্ছে করে হিজড়া হয়ে জন্মগ্রহণ করেননি, বাস্তবতার নির্মম সত্যের কারণেই তারা আজ হিজড়া। তবে কৃত্রিম ভাবেও হিজড়া বানানো হচ্ছে জোরপূর্বক অপারেশন ও হরমোন থেরাপি দ্বারা ।  এতে তাদের কোন হাত নেই কাজেই তাদেরকে কোনভাবেই অমর্যাদা তথা অবমূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। হিজড়াদের মানোন্নয়নে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশকিছু পদক্ষেপ ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে।


ইউনিভার্সেল সোসাইটি নোয়াখালী  কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, হিজড়ারা সাধারণত অযাচিতভাবে শরীরে হাত দেওয়া, জোরপূর্বক টাকা আদায়, অশালীন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন, শরীরের উপর পরে যাওয়া, নতুন জন্ম নেওয়া শিশুর জন্য টাকা আদায়, বিবাহ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে টাকা আদায়, দোকান থেকে টাকা আদায়, রেস্টুরেন্ট থেকে টাকা আদায়, গাড়ির জানালা দিয়ে টাকা গ্রহণ, এটিএম বুথের বাইরে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায়, ধমক দিয়ে টাকা আদায়, উলঙ্গ হয়ে কিংবা শরীরের কোন অংশের কাপড় তুলে টাকা আদায় ইত্যাদি কর্মের মাধ্যমে জনসাধারণের নিকট হতে টাকা আদায় করে থাকে। তাদের বেহায়াপনা, চাহিদা মাপিক টাকা না পাওয়ায় সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে মানুষ কে লজ্জা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করার কারণে তাদের উপর আক্রমণ করে। এখন হিজড়া গ্রাম গঞ্জে ও তাদের এধরনের উৎপাত বেড়ে চলছে ।  বেশ কয়েকবছর ঢাকা শহরে থাকায় প্রায়শই পাবলিক বাসে হিজড়াদের মুখোমুখি হবার অভিজ্ঞতা রয়েছে।


আবার টাকা উত্তোলনের সময় হিজড়ারাও যে অত্যাচারের শিকার হয় না বিষয়টা এমন নয়। মাঝে মধ্যে দেখা যায়, টাকা উত্তোলনের সময় হিজড়া সম্প্রদায় অত্যাচারের শিকার হয়।  তথাপি হিজড়াদের রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসে না। ঘটনার পরম্পরায় কয়েকজন হিজড়া একসাথে হয়ে এবং ঘটনাস্থলে পুলিশের সহায়তায় ধর্তব্য বিষয়ের মীমাংসা করতে হয়। 


সুতরাং দেখা যাচ্ছে, হিজড়ারা যেমন সামাজিকভাবে অস্বস্থির সৃষ্টি করে ঠিক তেমনি তারাও শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়ে থাকে। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এক পক্ষ অন্য পক্ষকে প্রতিপক্ষ মনে করে থাকে। এক পক্ষে সাধারণ জনতা ও অন্য পক্ষে হিজড়া সম্প্রদায়। এ ধরনের অমূলক ভাবনা চিন্তা দূর করে হিজড়াদেরকে মেইনস্ট্রিমে নিয়ে আসা উচিত সমাজের স্বার্থেই বিশেষ করে সামাজিক অবক্ষয় নিরসনে।


হিজড়ারা সামাজিক অস্বস্তিমূলক যে সকল কর্ম করে থাকে তার থেকে পরিত্রাণের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী হয়ে পড়ছে। পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করে ক্ষান্ত না হয়ে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলে হিজড়াদেরকে সামাজিক বিশৃঙ্খলামূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা যাবে। 


পদক্ষেপগুলি হচ্ছে, (১) হিজড়াদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ প্রদান করা, (২) অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, (৩) নাগরিক হিসেবে মানবাধিকার নিশ্চিত করা, (৪) জনগণের মধ্যে হিজড়াদের নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অর্থাৎ হিজড়ারা যদি স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ পায় তাহলে হিজড়াদের দ্বারা সংগঠিত এহেন ঘৃণিত কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করা সম্ভবপর হবে। কারণ, হিজড়াদেরকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। (৫) উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য। (৬)  সরকার প্রদত্ত সকল ধরনের সামাজিক সুযোগ সুবিধা হিজড়াদের জন্য বরাদ্দ দিতে হবে। (৭) কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।


সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী দেশে মোট হিজড়ার সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের মতো। সুতরাং তাদেরকে যথাযথভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে জনমনে হিজড়া নিয়ে যে অস্বস্তি রয়েছে তা আর থাকবে না। বর্তমান সরকার হিজড়াদের মানোন্নয়নে বেশকিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়ন হলে সুফল দেখতে পারবো আমরা। 


তবে এ বিষয়ে হিজড়া সম্প্রদায়ের দায়ও কোন অংশে কম নয়। তাদের জন্য বরাদ্দকৃত সুবিধাগুলো গ্রহণ করার মাধ্যমে নিজেদের যথার্থতাকে সমাজের মধ্যে তুলে ধরতে হবে। তাহলেও জনজীবনে হিজড়া সম্প্রদায় কর্তৃক আহুত অস্বস্তিগুলো অচিরেই দূরীভূত হয়ে যাবে।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024