|
Date: 2024-02-22 03:54:29 |
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল খোশবদন জি, ইউ আলিম মাদ্রাসা এমপিও হওয়ার পর বিভিন্ন কৌশলে বর্তমান অধ্যক্ষ মোঃ একরামুল হকের নাটকীয় কারিশমায় নিয়োগ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে।
এনিয়ে মাদ্রাসার পৌরনীতি প্রভাষক মোছাঃ অজিফা খান মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ ৮টি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছেন৷
গত ২০২২ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির (আলিম স্তর) এম.পি.ও ভুক্ত হয়। গত ৬ জুলাই নতুন করে ২ হাজার ৭১৬টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করেছিল সরকার। এরমধ্যে একটি ছিল ক্ষেতলাল খোশবদন জি, ইউ আলিম মাদ্রাসা। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আলিম শাখা শুরু থেকে যারা শিক্ষক-কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, এমপিওভুক্ত হওয়ার পর তাদের একটি অংশকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এমপিওভুক্ত হওয়ার পর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিয়োগ বাণিজ্য করে হাতিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। তাদের অভিযোগ, মাদ্রাসার বর্তমান অধ্যক্ষ মোঃ একরামুল হক তার মনোনীত সহযোগীদের নিয়ে এমপিওভুক্ত হওয়ার পর আলিম শাখায় শুরু থেকে চাকরিতে থাকা নিয়মিত ৩ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করেছেন। মোটা অংকের টাকা দিতে না পারায় এসব শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করে তাদের স্থলে নতুনদের নিয়োগ দিয়েছেন। শুধু তিনটি ‘প্রভাষক’ পদের নিয়োগে একেক জনের কাছ থেকে ১৫ -১৭ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন বেশি অর্থ প্রদানকারী শিক্ষককে। একইসঙ্গে অর্থ না দেওয়া বা দিতে না পারার কারণে নতুন তালিকায় বাদ পড়েছেন পুরাতন শিক্ষকরা৷ মাদ্রাসার নিয়মিত শিক্ষক অজিফা খান, মোঃ সোহেল রানা ও মোঃ আনোয়ার হোসেনের স্থলে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নতুন শিক্ষক৷
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফরহাদ হোসেন, জান্নাতি খাতুন, নাজমুল রেবেকা আক্তারসহ ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত আলিম শিক্ষার্থীরা ইংলিশ প্রভাষক মাহফুজার রহমান চপলকে চিনেন না এবং ক্লাস নিতেও তারা দেখেননি কোনদিন।
মাদ্রাসায় নিজস্ব প্রচারপত্রে চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের নাম আছে, যদিও বর্তমান অধ্যক্ষের দাবি তাদের কেউই এখানে চাকরি করতেন না এবং দু-একজনের অন্যত্র চাকরি হওয়াই চলে গেছেন৷
চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের অভিযোগ, নতুন নিয়োগে শিক্ষকদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫ থেকে ১৭লাখ করে নিয়েছেন অধ্যক্ষ একরামুল হক। ব্যানবেইসের তালিকায়ও রয়েছে চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের নাম৷
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো(ব্যানবেইস) ঘেটে দেখা যায়, ক্ষেতলাল খোশবদন জিইউ আলিম মাদ্রাসার ব্যানবেইসে ২০১৬ সালের তথ্যে মোঃ সানোয়ার হোসেন, রুহুল আনোয়ার, আনোয়ার হোসেন ও দেলোয়ার হোসেনসহ মোট চার জনকে ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তারিখে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেখানো হয়।
২০১৭ সালের তথ্যে একই তারিখে সোহেল রানা নামের আরও একজন শিক্ষককে নিয়োগ দেখানো হয়। তারপর ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এই পাঁচজন শিক্ষকের একই তথ্য পাওয়া যায়।
২০১৯ সালের তথ্যে হঠাতই উদয় হয় রাবেয়া সুলতানা নামের আরেক শিক্ষকের (সহকারী শিক্ষক, ইংরেজি পদে)। যার নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর। জন্মতারিখ দেখানো হয় ১০ অক্টোবর ১৯৮৬। ২০২১ সাল পর্যন্ত রাবেয়া খাতুনের তথ্যও একই থাকে।
২০২১ সালে এসে প্রভাষক আনোয়ার হোসেনকে ইংরেজি, সানোয়ার হোসেনকে বিজ্ঞান, মোঃ সোহেল রানাকে বিজ্ঞান, মোঃ দেলোয়ার হোসেনকে বিজ্ঞান এবং রুহুল আনোয়ারকে মানবিক বিভাগের সহকারী প্রভাষক পদে দেখানো হয়।
২০২২ সালে তথ্যে ব্যাপক রদবদল হয়। সেখানে দেখা যায়, মানবিক বিভাগের সহকারী প্রভাষক রুহুল আনোয়ার, বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সানোয়ার হোসেন ও ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক দেলোয়ার হোসেনের নিয়োগ দেখানো হয় ২০১৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর। এছাড়াও বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মোঃ সোহেল রানা ও ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আনোয়ার হোসেনকে বাদ দিয়ে সেখানে আবু নাছের আকন্দ ও রাবেয়া খাতুনের নাম যুক্ত করা হয়েছে।
অবাক করা ব্যাপার ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক রাবেয়া খাতুনের নাম দুইবার দেখানো হয়। একটাতে দেখানো হয় সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি) জন্মতারিখ,১০ অক্টোবর ১৯৮৬। আরেকটাতে দেখানো হয়েছে, প্রভাষক (ইংরেজি), জন্মতারিখ ৯ অক্টোবর ১৯৮৬।
২০২৩ সালের তথ্যে এসব শিক্ষকদের যোগদানের তারিখ ২৬ ডিসেম্বর থেকে আবারও ২৭ ডিসেম্বর দেখানো হয়। আগের তথ্যে ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক দেখানো রাবেয়া খাতুনের নাম বাদ দিয়ে সেখানে মাহফুজার রহমান নামের আরেক জনের নাম দেখানো হয়।
এই মো. মাহফুজার রহমান চপল পূর্বে কর্মরত ছিলেন উপজেলার মিনিগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ২০১৫ সালের আগের নিয়োগ ও ১১-১২ নিবন্ধন ব্যাকডেটে তার যোগদানের সময় বয়স দেখানো হয়েছে। তিনি ২০১৭ সাল থেকে (৫ নভেম্বর) ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হিসেবে সরকারি বেতন ভাতা উত্তোলন করেছেন৷ গত ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। উক্ত মামলার জয়, ১১৪৪/১/৫ স্মারকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সহকারী শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়৷ তিনি গত তিন মাস যাবত ক্ষেতলাল খোশবদন আলিম শাখায় ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে ক্লাস নিচ্ছেন৷ অথচ মাদ্রাসা স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ অনুযায়ী, চাকরিপ্রার্থীরা প্রতিষ্ঠান চাহিদা মাফিক এনটিআরসির গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসির তত্ত্বাবধানে শিক্ষক নিয়োগ করা হয়ে থাকে।
এ নিয়ে চাকরিচ্যুত আরেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের জানান, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আমাকে চাকরিচ্যুত করে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটি করেছেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ একরামুল হক। টাকা ছাড়া তিনি কিছুই বুঝেন না। মাদ্রাসাটি তিনি অবৈধ বাণিজ্য কেন্দ্র বানিয়েছেন বলে অভিযোগ তার।
মাদ্রাসার ইংরেজি প্রভাষক আনোয়ার হোসেন বলেন, আমি দীর্ঘদিন ওই প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে পরিশ্রম করেছি। এমপিও হওয়ার পর প্রিন্সিপাল আমার সাথে অমানুষিক নির্যাতন করেন। এখন পর্যন্ত আমি কোন রিজাইন লেটার দেয়নি এবং বেনবেইসে আমার নাম আছে। ২০২৩ সালে এনটিআরসির গণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এবছরের ১ জানুয়ারি বগুড়ার একটি প্রতিষ্ঠানে আমার ইন্ড্রেক্স হয়েছে৷ আমার স্থলাভিষিক্ত ইংরেজি প্রভাষক পদে একমাত্র এনটিআরসি নিয়োগ দিতে পারে। প্রিন্সিপাল ব্যাকডেটেড কাউকে নিয়োগ দিয়ে থাকলে এটি তদন্ত করা উচিত৷
অজিফা খান কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, দীর্ঘ ১৩ টি বছর দুধের বাচ্চাকে নিয়ে চাকরি করেছি। আমাকে অন্যায় ভাবে নির্যাতন করে চাকরিচুত্য করা আছে৷ আমি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। শেষ পর্যন্ত আমি আইনি লড়াই লড়বো৷
ক্ষেতলাল খোশবদন জি, ইউ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. একরামুল হকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার প্রতিষ্ঠানে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনেও একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য না দিয়ে দেখা করবেন বলে ফোন কেটে দেন।
আর সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে মাদ্রাসার সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম মোরশেদ জানান, সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে কোন শিক্ষক নিয়োগ হয় নাই৷ আমি যতদূর জানি ২০২১ এর পরিপত্র অনুযায়ী এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হয়ে থাকে। সাবেক সভাপতির মৃত্যুর পর সুকৌশলে ব্যাকডেটে এসব শিক্ষকদের নিয়োগ দিয়েছেন বলে আমার কাছেও একটা অভিযোগ এসেছে৷ আর আমি নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে কিছুই জানিনা। অধ্যক্ষ একরামুল হক কিভাবে এসব করেছেন তিনি তার জবাব দিবেন। আমি এসবের মধ্যে নেই৷
© Deshchitro 2024