মানুষ মানুষের জন্য।একে অপরের বিপদে এগিয়ে আসা ও একে অপরকে সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করা এবং অবহেলিত সমাজের প্রয়োজন পূর্ণ করার অন্যতম মাধ্যম কর্জে হাসানা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায়, সওয়াবের নিয়তে বিনা শর্তে কাউকে কোনো কিছু ঋণ দিলে তাকে ‘কর্জে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ বলে। অর্থাৎ এমন ঋণ বা কর্জ দেয়া যেটা সময়মতো পরিশোধ করা হবে; কিন্তু দাতা কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা সুবিধা নিতে পারবেন না। আর্থিক ইবাদতের মধ্যে অন্যতম হলো 'কর্জে হাসানা' বা উত্তম ঋণ।
আপসোস! সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে কর্জে হাসানার প্রথা চালু না থাকায় আমাদের সমাজে সুদের প্রচলন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে দেশে ধনী দরিদ্রের বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৩০)
মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে মানুষকে উত্তম ঋণ কিংবা কর্জ হাসানা প্রদানের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। উত্তম ঋণের বহুগুণ বিনিময় ঘোষণা করেছেন।
আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, "এমন কে আছে যে আল্লাহকে কর্জ কিংবা ঋণ দেবে উত্তম ঋণ; অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহই সংকোচিত করেন এবং তিনিই প্রশস্ততা দান করেন এবং তারই নিকট তোমরা ফিরে যাবে।" (সূরা বাকারাহ-২৪৫)।
আল কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "কে সেই ব্যক্তি,যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিবে, এরপর তিনি তার জন্যে তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।" (সূরা আল হাদীদ-১১)।
ছোটবেলা থেকেই আব্বা হুজুর শায়খুল হাদীস আল্লামা ফখরুদ্দীন রহ ( মাদরাসা-ই-আলিয়া,ঢাকার সাবেক মুহাদ্দিস, সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ, চুনতী হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসার শায়খুল হাদীস ছিলেন।) কে দেখে এসেছি সুদের সাথে জিহাদ করে আসতে। সুদ মুক্ত সমাজ গড়তে প্রতিষ্ঠা করেন "ফায়রুল খাইর" নামে একটি সংগঠন। যদিও এই সংগঠন বেশী দূর প্রচার ও প্রসার হয়নি। এইটা তিনি এককভাবে পরিচালনা করতেন তার নিজস্ব ইনকাম থেকে। তিনি বিনা শর্তে ও বিনা ডকুমেন্টস ছাড়া আমৃত্যু পর্যন্ত কর্জ হাসানা দিয়ে গেছেন। প্রমাণ হিসেবে শুধু লিখে রাখতেন তার ব্যক্তিগত ডায়রীতে ও চেক বইয়ের ছিড়া অংশে। তার দেয়া কর্জ দিয়ে অনেকেই স্বাবলম্বীও হয়েছে। আপসোস! আজ অবধি পর্যন্ত সেই কর্জ পরিশোধ করেনি অনেকেই। এমন কি কর্জ গ্রহীতারা আজ স্বাবলম্বী হয়ে তার অবদান ভুলে গিয়ে তার সাথে কিংবা তার পরিবারের সাথে নাফরমান করতে দ্বিধাবোধ করেনি।
যাই হোক আব্বা হুজুর থেকে শিখে বিশেষ করে ভার্সিটি লাইফে বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয় স্বজনদেরকে নিজের ইনকাম থেকে অনেকজনকে কর্জ হাসানা দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমারও। অবশ্যই জীবনের ১ম বড় ভাইয়াকে মাত্র ৩০০০ টাকা দিয়েই আমার কর্জ হাসানার যাত্রা শুরু করেছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ এখনো পর্যন্ত আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব কিংবা সহপাঠীদেরকে নিজের সাধ্যমত কর্জ হাসানা দিয়ে আসছি। সর্বোচ্চ ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা কর্জে হাসানা দিয়েছি। ভবিষ্যতে আব্বা হুজুরের প্রতিষ্ঠিত "ফায়রুল খাইর" সংগঠনটি জীবন্ত করার একটা প্ল্যান আছে। তাছাড়া চন্দনাইশ উপজেলার মাওলানা মঞ্জিলে ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে "আল্লামা মুফতি শফিউর রহমান (রহ) স্মৃতি ট্রাস্ট" নামে আমরা ১০ জন মিলে অরাজনৈতিক, উন্নয়ন ও কল্যাণমুখী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করি। উক্ত সংগঠনে কর্জ হাসানা চালু রয়েছে। এই সংগঠনের মাধ্যমে সমাজের অনেকেই উপকৃত হয়েছে। বর্তমানে আমি এই সংগঠনের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করছি। ভার্সিটি লাইফ থেকেই স্বপ্ন দেখে আসছি সুদ মুুুক্ত সমাজ গড়ার।আল্লাহর জমীনে সুদ মুক্ত সমাজ গড়তে আজীবন কাজ করে যেতে চাই। একই সাথে আল্লাহ পাক আমাকে আমৃত্যু পর্যন্ত কর্জে হাসানার মতো এই মহৎ কাজ করার তাওফীক দান করুক।
লেখক: সংগঠক ও কলামিস্ট।