|
Date: 2024-07-12 17:27:13 |
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত এবং টক অব দা কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে 'কোটা-বিরোধী আন্দোলন'। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান এই আন্দোলনে কোটা-প্রথার যৌক্তিক সমাধান চাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। সরকারের উপরিমহল চলমান এ-আন্দোলনে যে ভাবনায় আছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আসুন জেনে নেয়া যাক কোটা কী, কেন এই আন্দোলন এবং এর যৌক্তিকতাই বা কতোটুকু।
সরকারি চাকরিতে অনগ্রসর ও তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সম্মুখসারিতে নিয়ে আসার জন্য পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কমবেশি কোটার প্রচলন আছে। বাংলাদেশে কোটা ব্যবস্থার সূচনা হয় ১৯৭২ সালে। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থার চালু করেন। সেসময় সরকারি চাকরিতে ৪০ শতাংশ জেলা কোটা, ১০ শতাংশ নারী কোটা, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের উপহার হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা এবং শুধু ২০ শতাংশ নিয়োগ দেওয়া হতো মেধার ভিত্তিতে।
পৃথিবীর কোনো দেশেই কোটা চিরস্থায়ী কোনো পদ্ধতি না। এটি প্রয়োজন অনুসারে বারবার সংস্কার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, সরকার 'ক' নামক জেলাকে ১৯৭২ সালে পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, কিন্তু ৫৪ বছর পর আজকে সে জেলা উন্নত হতে পারে। সেক্ষেত্রে নতুন সংস্করণে বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোন জেলা শিক্ষা-দীক্ষা, বাসস্থান, মৌলিক চাহিদায় পিছিয়ে রয়েছে তা পুনরায় সরকারকে ভাবতে হবে।
সরকারি চাকরিতে মাত্রাতিরিক্ত কোটাব্যবস্থার প্রতিবাদে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল 'কোটা সংস্কার আন্দোলন'। আন্দোলনকারীরা কখনোই কোটা বাতিলের পক্ষে ছিলেন না। তারপরেও সরকার সব ধরনের কোটাকে বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। ২০২৪ সালে এসে কোনো একজনেন রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ জুন হাইকোর্ট সেই পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ, নারী কোটা ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, উপজাতি কোটা ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী কোটা ১ শতাংশ রেখে মোট ৫৬ শতাংশই কোটার ভিত্তিতে এবং বাকি ৪৪ শতাংশ রাখা হয় সাধারণ মেধাবীদের জন্য।
যে বৈষম্যের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং পশ্চিম পাকিস্তানের হাত থেকে আমাদের স্বাধীনতা লাভ, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এই বৈষম্য পুরোপুরি অযৌক্তিক। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহাল রাখলেও 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের' ব্যানারে সারাদেশের শিক্ষার্থীরা তীব্র আন্দোলন করছে। ১৮ সালের পরিপত্রে শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করা হয়, কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীরা সকল গ্রেডে কোটা বাতিল করে নির্বাহী বিভাগের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ থেকে আইন পাশ করানোর কথা বলছে, যাতে পরবর্তীতে কেউ রিট করলেও হাইকোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করতে না পারে। তবে ১৮ সালের মতো কোটা বাতিলের ফাঁদে পড়তে চায় না সাধারণ শিক্ষার্থী। কোটা বাতিল নয় বরং সংবিধান অনুযায়ী পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য তা-যৌক্তিক মাত্রায় রাখা যেতে পারে। তবে কোনোভাবেই তা ৫ শতাংশের বেশি নয়। সরকার কাকে কত শতাংশ কোটা দিবে সে বিষয়ে কমিশন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা দ্রুত সরকার তাদের দাবি অনুযায়ী আইন পাশ করবে এবং মেধাভিত্তিক দুর্নীতিমুক্ত যোগ্য আমলার মাধ্যমে সরকারের যে 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশন, সেদিকে আরও একধাপ অগ্রসর হবে।
মোহাম্মদ আল আমীন
শিক্ষার্থী, অনার্স ৩য় বর্ষ, বাংলা বিভাগ।
হাজী মোহাম্মদ মুহসীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
© Deshchitro 2024