◾মো. তুহিন হোসেন : বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের অধিকাংশ নদী রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নাব্যতা হারিয়ে আজ বাংলার দুঃখে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ সংগঠিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ গুলোর মধ্যে বন্যা অন্যতম।সাম্প্রতি বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা সমস্যা দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে টন টন ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ।যার পরিমাণ ক্রমেই বেড়েই চলেছে যা একটি দেশের জাতীয় উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়ায়। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের অন্যতম শিল্প প্রধান অঞ্চল যশোর যেন এ ক্ষয়ক্ষতের অন্যতম অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যশোর জেলার দক্ষিণ -পূর্ব অংশে অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর, ডুমুরিয়া ও ফুলতলার কিছু অংশ নিয়ে ভবদহের অবস্থান।বিগত চার দশক ধরে এখানকার ৩৩০ কিলোমিটার এলাকার ৩ লক্ষ মানুষ জলাবদ্ধতায় ভুগছে। গত দুবছর কিছুটা কমলেও চলতি মৌসুমী ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে জলাবদ্ধতার বিস্তৃতি আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর অঞ্চলের ৩৫ টি গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে।


যেখানে ৫০০০০ কৃষকের ২৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়াও কয়েক হাজার মাছের ঘের বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষ ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ভবদহ জলাবদ্ধতা সমস্যা দীর্ঘদিনের হওয়া সত্ত্বেও এর কোন স্থায়ী সমাধান হয়নি। জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান কল্পে সবুজায়ন নামে পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৬১ সালে পাঁচটি স্থানে ৪৪ টি সুইস গেট স্থাপন করেন।


বর্তমানে ২১টি কপাটের মধ্যে ১৮ টি কপাট পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে।ফলে মুক্তেশ্বরী, শ্রী হরি ও টেকা নদী তার নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। আগে ভবদহ বিল দিয়ে ২৭ বিলের পানি নদীতে গিয়ে নামত। ১৯৮১ সালের পর থেকে জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে ৷ জোয়ারের সঙ্গে ভেসে আসা পলি সুইচগেট এর মুখে জমা হয়ে নদীর গতি পথ সরু হয়ে গেছে।



 ফলে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই নদীর দুকূল ছাপিয়ে সমতল প্লাবিত হয়। চলতি মৌসুমে কেশবপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর, ডুমুরিয়া অঞ্চলের ১০ লক্ষ মানুষ পানি বন্দি এবং ৬০ ভাগ মানুষের বসত ভিটায় পানি । বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভবদহ বিলের এ জলাবদ্ধতা সমাধানের জন্য টিআরএম স্থাপন , আমডাঙা খাল খনন, ২৭ বিল এলাকার অকাল জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত বিল খুকশিয়ার ওয়াপদার ৮ ব্যান্ড সুইস গেটের পলি অপসারণ জরুরি।  


৬০ এর দশকে ভবদহ থেকে বারোহাটি নদীটি ১৫০ থেকে ২০০ মিটার প্রস্থ ছিল কিন্তু বিগত কয়েক বছরে সেটি এখন মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিটারে নেমে এসেছে এর গভীরতা ৩-৫ ফুট। যশোর বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা কিন্তু সেখানকার চলমান সংকট কোনভাবেই যেন কাটছে না। বিগত সরকারের আমলে ডেল্টা ২১ প্রকল্প হাতে নিলেও তার কোন সুফল ভবদহে মেলেনি। এটির অন্যতম কারণ ছিল লাল ফিতার লাল দৌরাত্ম ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রভাবে জলাবদ্ধতা নিরাশনে দীর্ঘমেয়াদি কোন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়নি।ফলে ভবদহ আজ যশোরের দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।


স্বাধীনতার পরে অনেকবার ভবদহ বিলের জলাবদ্ধতা নিরাশানে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে কিন্তু সেটি ছিল অপরিকল্পিত ও ত্রুটিপূর্ণ যেখানে ছিল শুভঙ্করের ফাঁকি কাজেই ভবদহ বিল এখন যশোরের মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



লেখক : মো. তুহিন হোসেন 

তরুণ লেখক ও শিক্ষার্থী 

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024