|
Date: 2025-04-04 22:43:56 |
"কৃষক" শব্দটি উচ্চারণমাত্রই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে এক ক্লান্ত, মলিন মুখ। সমাজের একশ্রেণির মানুষ এই পেশাকে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখে, যেন এটি গৌণ, নগণ্য। অথচ সভ্যতার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে এই কৃষকদের শ্রমের ওপর। তারা নিঃশব্দে মানবজাতির খাদ্য ও অর্থনীতির ভিত্তি রচনা করেন। কিন্তু আধুনিক সমাজে তারা কি যথাযথ সম্মান পাচ্ছেন?
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) বলছে, বিশ্বে ৮০ কোটিরও বেশি মানুষ এখনো ক্ষুধার্ত অবস্থায় দিন কাটায়। অথচ কৃষকদের নিরলস পরিশ্রমেই প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের খাবার জোটে। বাংলাদেশে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০% আসে কৃষি খাত থেকে। কিন্তু এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর অবস্থা কেমন?
কৃষকরা চাষাবাদ করেন, ধান-গম-সবজি ফলান, গবাদি পশু লালন করেন-এই প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য। সূর্যের প্রখর তাপে, বর্ষার প্লাবনে কিংবা হিমশীতল শীতে-প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখেন। কিন্তু তাদের আয়ের অবস্থা কেমন?
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (BARC) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ধান উৎপাদন বিগত কয়েক দশকে বহুগুণ বেড়েছে, কিন্তু কৃষকের আয় আশানুরূপ বাড়েনি। কেন?
১. কৃষকরা সরাসরি বাজারে তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন না। ফলে ফড়িয়া, দালাল ও পাইকাররা কম দামে কৃষকের কাছ থেকে ফসল কিনে বেশি দামে বিক্রি করেন। এতে প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন।
২. বীজ, সার, কীটনাশক, সেচের খরচ বেড়ে চলেছে, কিন্তু ফসলের দাম সে অনুযায়ী বাড়েনি। কৃষকরা লাভবান হতে না পেরে ধার-দেনায় জড়িয়ে পড়েন। ফলে ঋণের বোঝা তাদের দারিদ্র্যের ফাঁদে আটকে রাখে।
৩. খরা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাত-এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষি উৎপাদনে বড় বাধা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দুর্যোগ আরও বাড়ছে, যা কৃষকদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা, চাকরি কিংবা শহুরে জীবনের দিকে ঝোঁক থাকলেও কৃষিকাজকে এখনো পিছিয়ে পড়া পেশা হিসেবে দেখা হয়। শিক্ষিত সমাজে কেউ কৃষক হতে চায় না। অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশা এটিই। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কৃষকদের উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়। জার্মানিতে কৃষকরা সরকারি ভর্তুকি পান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে নানা নীতি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে কৃষকদের প্রতি তেমন নজর দেওয়া হয় না।
তাদের এ দুর্দশা লাঘবে আমাদের তথা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়া অতীব জরুরী যেমন-
১. সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সরকারিভাবে ধান, গম, সবজি ক্রয় করে তাদের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করা উচিত।
২. কৃষকদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন তারা সহজে চাষের খরচ জোগাড় করতে পারেন।
৩. উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব।
৪. কৃষকদের জন্য সম্মানজনক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং তরুণদের কৃষিখাতে আকৃষ্ট করতে কৃষি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
যারা মাঠে ঘাম ঝরিয়ে খাদ্য উৎপাদন করেন, তারা অবহেলার পাত্র নন; বরং সভ্যতার স্থপতি। কৃষকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। যদি কৃষকরা উৎপাদন বন্ধ করে দেন, তবে কেমন হবে আমাদের ভবিষ্যৎ? উন্নয়ন, চাকরি, আধুনিক জীবন-সবকিছুই তখন অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই কৃষকদের যথাযথ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করাই হবে একটি টেকসই সমাজ ও অর্থনীতির মূল চাবিকাঠি।
লিখেছেনঃ
দিলীপ ভৌমিক
উন্নয়ন কর্মী
© Deshchitro 2024