সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জের ধলাই নদী ও তার তীরবর্তী সাদা পাথর বহুদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। পাহাড়ি ঝরনা থেকে বয়ে আসা স্বচ্ছ নদীজল, গাঢ় নীল আকাশের পটভূমিতে ঝলমল করা সাদা পাথরের স্তূপ—প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি এক অনন্য সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লাগামহীন লুটপাট ও অবৈধ পাথর উত্তোলনের কারণে এই সৌন্দর্য দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেখতে পাচ্ছি, প্রতিদিনই শত শত নৌকায় পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে। এসব কার্যক্রমে জড়িত আছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট, যার মধ্যে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিদিন নদীর তলদেশ থেকে যন্ত্র বা হাতের সাহায্যে পাথর তোলা হচ্ছে। ফলে নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং নদীর পাড় ভেঙে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি—সবই আছে, কিন্তু নেই কার্যকর অভিযান ও স্থায়ী নজরদারি। অনেক সময় অভিযান চালানো হলেও, তা হয় স্বল্পমেয়াদি ও আংশিক। সিন্ডিকেটগুলো দ্রুত আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

প্রশাসনের এই শিথিল অবস্থানকে কেন্দ্র করে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে উঠছে, যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

অবৈধ পাথর উত্তোলন পরিবেশ ও পর্যটনের উপর সরাসরি আঘাত হানছে। নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। তীরবর্তী গাছপালা ও মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি পর্যটন শিল্পে, পাথরের স্তূপ কমে যাওয়ায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে এলাকা। পর্যটক সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে, ফলে স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত। নৌকাচালক, গাইড, দোকানি—সবার আয়ের পথ সংকুচিত হচ্ছে। বলা বাহুল্য স্থানীয় জীবিকা হুমকির মুখে। 

পাথর চুরি ঠেকাতে সমাধানের সম্ভাব্য পথ হিসেবে কঠোর আইন প্রয়োগ আবশ্যক। দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও টাস্কফোর্স গঠন করে অবৈধ উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ করা। স্থানীয় জনগণকে সচেতন করে পরিবেশ রক্ষার কাজে যুক্ত করা। ইকোট্যুরিজম প্রজেক্টের মাধ্যমে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করে অবৈধ উত্তোলনের প্রলোভন কমানো। যার মাধ্যমে টেকসই পর্যটন উন্নয়ন করা সম্ভব। তার পাশাপাশি সিন্ডিকেটে জড়িতদের রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।

ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি, জীবিকা ও সংস্কৃতিরও অংশ। কিন্তু লাগামহীন লুটপাট ও প্রশাসনিক উদাসীনতা এই সম্পদকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাদা পাথরের সৌন্দর্য কেবল ছবির অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

- মোঃ নাজমুল হাসান: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

Email: legalnazmul@gmail.com

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024