বাংলা ক্যালেন্ডারের শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের প্রাণস্পন্দন। এই উৎসবের সূচনা হয় মহাষষ্ঠীতে, যখন মা দুর্গার বোধন সম্পন্ন হয়। বোধন শব্দের অর্থ হলো জাগ্রত করা—অর্থাৎ, দেবীকে মর্ত্যে আহ্বান জানিয়ে পূজার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা। এই দিনটির মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের চারদিনের যাত্রা শুরু হয়, এবং বাঙালির মনে আনন্দ, ভক্তি ও উদ্দীপনার ঢেউ বইতে শুরু করে।মহাষষ্ঠীর ভোরে শুরু হয় কল্পারম্ভ। মণ্ডপে ঘট স্থাপন করা হয়, যা পূজার কেন্দ্রীয় প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ঘটের মধ্যে জল ভরা তাম্রপাত্রে দেবীর আবাহনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। এরপর শুরু হয় চণ্ডীপাঠ ও মন্ত্রোচ্চারণ, যা দেবীকে মর্ত্যে আগমন ঘটাতে সহায়ক।ষষ্ঠীতে প্রতিমার আবরণ উন্মোচিত হয়। এই চক্ষুদান বা অভিষেক মুহূর্তে বিশ্বাস করা হয়, দেবীর প্রাণ প্রতিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময়ই বাঙালি অনুভব করেন, মা দুর্গা মর্ত্যে উপস্থিত হয়েছেন।বোধন হলো এক প্রকার আবাহন বা আমন্ত্রণ। ঘটের চারপাশে তীরকাঠি ও সুতোর সাহায্যে একটি সীমারেখা তৈরি করা হয়, যা অশুভ শক্তি থেকে পূজাকে সুরক্ষিত রাখে। বিল্বশাখা দিয়ে দেবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যা শাস্ত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিল্বপাতা শিবের মতোই দুর্গার কাছে প্রিয়, এবং এটি বোধনের পর মর্ত্যে দেবীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে।বোধনের পর আসে অধিবাস ও আমন্ত্রণ। পূজার প্রতিটি রীতিনীতির মধ্যেই রয়েছে মানবিক ও আধ্যাত্মিক বার্তা—যে কেউ সত্য ও ভক্তির সঙ্গে উৎসবে অংশ নেন, তিনি অভ্যন্তরীণ শক্তি ও মননশীলতার জাগরণ অনুভব করেন।পুরাণে বর্ণিত আছে, রাবণের সঙ্গে যুদ্ধের আগে দশরথ পুত্র রামচন্দ্র অকাল বোধন করেছিলেন। সেই সময় দক্ষিণায়নকাল ছিল, যা দেবতাদের রাত হিসেবে গণ্য। শাস্ত্রানুযায়ী, এই সময় পূজা করা হয় না। তবুও বিশেষ প্রয়োজনবশত রাম দুর্গাকে জাগিয়ে তোলেন, আরাধনা করেন শক্তি ও সৌভাগ্যের জন্য।এই ঘটনার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় অকাল বোধনের ধারণা—সময়ের সীমা ভেঙে, প্রয়োজনের তাগিদে শক্তিকে আহ্বান করা। এই বোধন রামের রাবণের বিরুদ্ধে বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী, সূর্যের উত্তরায়নকাল হলো দেবতাদের দিন, আর দক্ষিণায়নকাল রাত। সাধারণত দেবতাদের পূজা সকালেই করা হয়। কিন্তু দুর্গাপূজা শরৎকালে, অর্থাৎ দক্ষিণায়নে। তাই পূজার আগে বোধনের মাধ্যমে দেবীকে জাগ্রত করা হয়।এখানে একটি গভীর প্রতীক লুকিয়ে আছে—রাতের অন্ধকারে আলো আনার মতো, জীবনের অন্ধকারে শক্তিকে আহ্বান করতে হয়। বোধন শুধুমাত্র আচার নয়, এটি মানুষের অন্তর্গত চেতনা ও শক্তিকে জাগ্রত করার প্রক্রিয়া।ষষ্ঠীর দিন থেকেই শুরু হয় পূজার উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রতিমার মুখমণ্ডল উন্মোচন, ঢাকের তালে আনন্দ, উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনি—সবই বাঙালির মনোজগতে এক অনন্য আনন্দের সঞ্চার করে।এই দিনটি কেবল ধর্মীয় নয়, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীকও বটে। মা দুর্গার আগমনে যেমন শিশুদের আনন্দ সীমাহীন হয়, তেমনি ষষ্ঠীর বোধনে সমগ্র বাঙালি ঐক্য ও উৎসাহে উদ্দীপ্ত হয়।ষষ্ঠীর বোধন মানুষের মনকে আভ্যন্তরীণ শক্তি ও ধৈর্যের সাথে সংযুক্ত করে। প্রতিমার আবরণের মতোই আমাদের ভেতরের আবরণও সরিয়ে দেয় এই আচার। এটি শুধু পূজার সূচনা নয়, একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া—যা ভক্তিকে উদ্দীপ্ত করে, সাহস ও আশা জাগায়।অকাল বোধনের কাহিনি আমাদের শেখায়—যে কেউ সততা, ভক্তি ও দৃঢ়তার সঙ্গে শক্তিকে আহ্বান করে, সে যেকোনো পরিস্থিতি জয় করতে সক্ষম।আজকের সমাজে অশুভ শক্তি যেমন উপস্থিত—হিংসা, দুর্নীতি, বৈষম্য—তেমনি আমাদের প্রয়োজন অকাল বোধনের দৃষ্টান্ত। সমাজকে শক্তিশালী করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, সাহস ও ন্যায়কে জাগ্রত করতে বোধন এক অনন্য প্রতীক।দেবী দুর্গা নারীশক্তি, প্রতিরোধ ও প্রেরণার প্রতীক। ষষ্ঠীর বোধন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি নারীর মধ্যে শক্তি বিদ্যমান, যা অন্যায় ও অশুভকে প্রতিহত করতে সক্ষম।মহাষষ্ঠীর বোধন দিয়ে আমরা জানতে পারি শক্তি সবসময় সুপ্ত থাকে; তাকে জাগিয়ে তুলতে হয়।অন্যায় ও অশুভকে প্রতিহত করতে সাহস দরকার।কখনও নিয়ম ভাঙার মধ্য দিয়েই নতুন পথের সূচনা হয়।সংকটময় সময়ে মানবিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে আহ্বান করা প্রয়োজন।মহাষষ্ঠীর বোধন কেবল দুর্গাপূজার সূচনা নয়, এটি বাঙালির হৃদয়ের উৎসব। পৌরাণিক, শাস্ত্রীয় ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এটি জাগরণের প্রতীক। আজকের অশুভ ও অন্ধকারময় পৃথিবীতে, মহাষষ্ঠীর বোধন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই কখনো সময়ের অপেক্ষা করে না। সাহস, ভক্তি ও একাগ্রতার মাধ্যমেই আমরা শক্তিকে আহ্বান করে জীবনকে আলোকিত করতে পারি।(লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামষ্ট)

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024