|
Date: 2025-10-11 06:32:53 |
ঝিনাইদহের শৈলকুপা শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে ১৩ কিলোমিটার দুরের গ্রাম বাগুটিয়া। গ্রামের একপ্রান্তে কাঁচা রাস্তার পাশে চুন-সুড়কি দিয়ে গাঁথা ৯ রুমের পুরনো একটি দ্বিতল বাড়ি। এলাকার অধিকাংশ মানুষই জানেনা বাড়িটির ইতিহাস। শুধু জানেন হিন্দু সম্প্রদায়ের কারো ছিল, এখন সেখানে হাজী কিয়াম উদ্দিনের ছেলেরা বসবাস করেন। তারা কীভাবে বাড়িটি ভোগদখল করছেন তা জানেন না এলাকাবাসী। গ্রামের গুটিকয়েক মানুষ কেবল জানেন যে, ‘বাড়িটি কোনো এক বিপ্লবী মানুষের।’ সেই বিপ্লবী মানুষটি হচ্ছেন তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী, সংগ্রামী নারী ইলা মিত্র। শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামের এই বাড়িটি ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ি। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে এই বাড়িটি দাঁড়িয়ে থাকলেও রয়েছে বে-দখল। ভেঙে পড়তে শুরু করেছে ইটের গাঁথনিগুলো। চওড়া দেয়ালে ঘেরা প্রাচীরের অনেক অংশ ভেঙে ফেলেছে দখলদাররা। শুধু বাড়ি নয়, দখল করা হয়েছে ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের রেখে যাওয়া শত শত বিঘা জমি। সরকারের খাতায় এগুলো ভিপি তালিকাভুক্ত হলেও বাস্তবে তা এলাকার প্রভাবশালীদের দখলে।
ইলা মিত্র অবিভক্ত ভারতের কিংবদন্তী বিপ্লবী। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের চাকরীর সুবাদে তাঁর জন্ম কলকাতায়। ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বেঙ্গলের ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। মা মনোরমা সেন গৃহিনী। ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রাম তাদের পৈত্রিক নিবাস। ইলা মিত্রের জন্ম কলকাতায় হলেও ছোট বেলায় তিনি বেশ কয়েকবার বাগুটিয়া গ্রামে এসেছেন। ১৯৪৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুরের জমিদার বাড়ির রমেন্দ্রনাথ মিত্রর সঙ্গে ইলা সেনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তার নাম হয় ইলা মিত্র।
ইলা মিত্র তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৯৪৩ সাল থেকে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ১৯৪৮ সালে ৬ মার্চ এদেশের জন্য পৃথকভাবে কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠিত হলে ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চাপাইনবাবগঞ্জের নাচোল অঞ্চলে তেভাগা দাবিতে কৃষকদের নেতৃত্ব দেন। যা ইতিহাসে নাচোল বিদ্রোহ নামে পরিচিত পেয়েছে। ১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়িক দাঙ্গা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার সর্বত্র। ইলা মিত্র কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নোয়াখালীর দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় সেবা ও পুনর্বাসনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ইলা মিত্র আত্মগোপন অবস্থায় ১৯৪৮-৪৯ সালে নাচোল কৃষকদের ফসলের দাবিতে ‘ তেভাগা আন্দোলন’ এর ডাক দেন এবং কৃষকদের ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ান। এই আন্দোলনের সময় তার উপর পুলিশের অমানবিক নির্যাতন চলে। 'পাকিস্তানি ইনজেকশন' নামে কুখ্যাত নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যৌনাঙ্গের গরম ডিম দেয়, চুল টেনে ছিঁড়ে ও ধর্ষণের মতো পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে কলকাতায় চলে যান। এরপর তিনি কলকাতার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও গনতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তিনি কলকাতার মানিকতলা নির্বাচনী এলাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে তিনি কলকাতা সাউথ সিটি কলেজের বাংলা সাহিত্যে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। পাশাপাশি কলকাতার সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠনের কাজ করতে থাকেন। মেধা ও নেতৃত্বের গুনে তিনি ধাপে ধাপে উপরে উঠতে থাকেন। বিধান সভায় ডেপুটি লিডার হন। ১৯৬২ সাল থেকে শিক্ষক প্রতিনিধি হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট মেম্বার নির্বাচিত হন পাঁচবার।
সরেজমিনে ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরনো আমলের নিদর্শন চুন-সুড়কির তৈরী দ্বিতল বাড়িতে বসবাস করছেন হাজি কিয়াম উদ্দিনের তিন সন্তান। বড় ছেলে আলী হোসেন জানান, 'তারা বাগুটিয়রা ১১৬ নং মৌজার ২৩৪৫ দাগের জমির উপর বাড়িটি সহ ৮৪ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। বাবা হাজি কিয়াম উদ্দিন বহু পূর্বে ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের শ্বাশুড়ি সরোদিনী সেনের কাছ থেকে এই জমি কিনে নেন। সরোদিনি সেন কিভাবে এই জামির মালিক হলেন তা তিনি বলতে পারেন না বলে জানান। তিনি ছাড়াও তার ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রশিদ ও রাশিদুল ইসলামের পরিবার এখানে বসবাস করেন। মূল ঘরটির ৫ টি রুম ব্যবহার করা যায়। ভাইয়েরা সেগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বাকি রুমগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
কিংবদন্তী নারী ইলার শৈশব কৈশর সময় পার করা বাগুটিয়া, গোপালপুর, শেখরা, রঘুনন্দপুর, শাহাবাজপুর সহ কয়েকটি গ্রামে। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন, মা মনোরমা সেন এবং পিতামহ রাজমোহন সেনের নামে রয়েছে কয়েকশ বিঘা জমি। এসব ভিপি সম্পত্তি হিসাবে সরকারী খাতায় থাকলেও তার সবটুকুই এখন বে-দখল। তবে ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান এসব সম্পত্তির ব্যাপারে সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি ও দুই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।
ইলা মিত্রের পরিবার সম্পর্কে ওই গ্রামের বাসিন্দা জানান, 'তারা শুনেছেন নগেন্দ্রনাথ সেন নামে এক ব্যাক্তি তাদের এলাকার ছোট-খাটো জমিদার ছিলেন। বাগুটিয়াসহ পাশ্ববর্তী কয়েকটি মৌজায় বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের অঢেল জমি-জিয়ারত ছিল। যা বর্তমানে এলাকার প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। হাজি কিয়াম উদ্দিন ছাড়াও জনৈক আমিনুল ইসলামের দখলে রয়েছে ওই নগেন্দ্রনাথ সেনের সিংহভাগ জমি। তবে তিনি যে ইলা মিত্রের বাবা ছিলেন এটা তারা জানতেন না। তার দাবি, বাড়িটি যদি ইলা মিত্রের হয় তাহলে এটি সংরক্ষণ করা জরুরী। তার মতে, এটা রক্ষা হলে এক কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস রক্ষা হবে। বাগুটিয়া গ্রামের ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ী ও সম্পদ রক্ষণাবেক্ষন করা উচিত।'
ইলা মিত্র ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। এমাসে কাছাকাছির সময়ে জন্ম ও মৃত্যু দিবস হলেও নেই কোন আয়োজন রাষ্ট্রীয়ভাবে। নেই জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে কোন কর্মসূচি। প্রতিবছর নানাবিধ কর্মসূচি থাকলেও ঝিনাইদহ তথা বিশ্বখ্যাত লিজেন্ড ইলা মিত্রের কর্মসূচি সম্পর্কে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক বলেন, ইলা মিত্রের বাড়ি সংরক্ষণের বিষয়টি অবগত। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিবেন বলে জানান। গণমাধ্যমের কাছে এমন কথা বরাবরই দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ বললেও কাজের বাস্তবায়ন বিন্দুমাত্র নেই। ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া রায়পাড়ায় বাড়িটি অবস্থিত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত এই বাড়িটি বর্তমানে একজন বিশেষ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ইলা মিত্রে বাড়ি
অবস্থান হল-বাগুটিয়া, শৈলকুপা উপজেলা, ঝিনাইদহ জেলা, বাংলাদেশ মোতাবেক স্থানাঙ্ক-
২৩.৬০০৫২৪১° উত্তর ৮৯.২৭৮৭৩৬২° পূর্বে বাসস্থান হিসেবে নির্মাণের করেছিলেন বনেদি পরিবারটি। বর্তমানে কালের সাক্ষী এ বাড়িটিকে পুরাকীর্তি ও প্রত্মসম্পদ একইসাথে বিপ্লবী ইলা মিত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার সংরক্ষিত স্থান ঘোষণা করেছে।
২০১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে উপ-সচিব মোঃ মকবুল হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার বাগুটিয়া (রায়পাড়া) গ্রামের ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৬৮ সালের (সংশোধিত ১৯৭৬) পুরাকীর্তি আইনে সংরক্ষণ উপযোগী।
ব্রিটিশবিরোধী ও তে-ভাগা আন্দোলের নেত্রী ইলা মিত্রের পৈত্রিক ভিটা অধিগ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঝিনাইদহের শৈলকুপার বাগুটিয়া গ্রামে তার পৈত্রিক ভিটা।
বিগত ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় পুরাকীর্তি হিসেবে বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য গেজেট প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পত্র সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ইলা মিত্রের স্মৃতি রক্ষা আন্দোলন:
ঝিনাইদহ ও শৈলকুপায় ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ইলা মিত্র পৈত্রিক বাড়ি ও স্মৃতি রক্ষা আন্দোলন সফভাবে সংগঠিত হয়। ইলা স্মৃতি রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক ও জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক সুজন বিপ্লব বিপ্লব এই প্রতিবেদকে বলেন, 'সারা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি নিপীড়ণের শিকার রাজনীতিবিদ হলেন ইলা মিত্র। কমরেড ইলা মিত্র ভারত ও বাংলাদেশ-উভয় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা'য় স্বীকৃত হয়েছে। উপমহাদেশের মানুষের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠায় সারাজীবন লড়াই করলেও আজ নিজের পিতৃভূমি-বাড়িসহ জমাজমি সবটুকুই অরক্ষিত। বাড়িটির বর্তমান বাসিন্দাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসাবে অবিলম্বে ইলা মিত্রের বাবার বাড়ি সংরক্ষণের দাবি ঐতিহাসিক প্রয়োজন। যোগ্য দেশপ্রেমিক ও মানবিক প্রজন্ম গড়তে সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাঠ দিতে নাচোল বিদ্রোহের রানিমা ইলা মিত্রকে অবশ্যই ধারণ করা জরুরি।'
নাচোলে কমিউনিস্ট বিপ্লবী ইলা মিত্র:
নাচোল বিদ্রোহ ছিল ১৯৪৯-১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল অঞ্চলে সংঘটিত একটি কৃষক বিদ্রোহ, যা মূলত তেভাগা আন্দোলনের অংশ ছিল এবং ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সাঁওতাল ও অন্যান্য কৃষকদের নিয়ে গড়ে ওঠে। এটি ছিল আধিয়ার কৃষকদের একটি অভ্যুত্থান এবং এর মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
ইলা মিত্রের নেতৃত্বে তেভাগা সংগ্রাম হলেও তিনি তেভাগা আন্দোলন নয় প্রকৃতপক্ষে নাচোল কৃষক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেত্রী ইলা মিত্র ছিলেন নাচোল বিদ্রোহের অবিসংবাদিত সংগঠক। তেভাগা আন্দোলন ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর -এ শুরু হয়ে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চলে। বর্গা বা ভাগ-চাষীরা এতে অংশ নেয়। মোট উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুইভাগ পাবে চাষী, এক ভাগ জমির মালিক- এই দাবি থেকেই তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত। আগে বর্গাপ্রথায় জমির সমস্ত ফসল মালিকের গোলায় উঠত এবং ভূমিহীন কৃষক বা ভাগ-চাষীর জন্য উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক বা আরও কম বরাদ্দ থাকত। যদিও ফসল ফলানোর জন্য বীজ ও শ্রম দু'টোই কৃষক দিত। তৎকালীন পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিমবঙ্গে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়। তবে দিনাজপুর ও রংপুর, খুলনা, যশোর, নড়াইলে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল।
তেভাগা ১৯৪৬-৪৮, নাচোল বিদ্রোহ ১৯৪৯-৫০- সময়কালই আলাদা হলেও তেভাগা আর নাচোল বিদ্রোহ পরিপূরক হলেও নাচোল কৃষকের এক অগ্নিগর্ভ আন্দোলনে গোটা পৃথিবীকে আলোড়িত করে। তবে তেভাগা আন্দোলনের অনুরণন ও একই দাবিতে নাচোল বিদ্রোহ হয়। তাই নাচোল কৃষক বিদ্রোহ ইতিহাসে স্বতন্ত্র ও কৃষকজনগণ ও আদিবাসী সাঁওতালদের রক্তস্রোতের অনন্য অধ্যায়।
ইলা মিত্র বাড়ি সংরক্ষণে বিশিষ্টজনের দাবি:
'ঐতিহাসিক নাচোল বিদ্রোহের কিংবদন্তি কমরেড ইলা মিত্র'র পৈত্রিক বাড়ি সংরক্ষণ, নাচোল কৃষক আন্দোলনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশসহ বিচারিক রায়কে অবৈধ ঘোষণা, পাঠ্যপুস্তকে জীবনী সংযোজন, ইলা মিত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, কেসি কলেজ ছাত্রীনিবাস ও সড়ক নামকরণের গণদাবি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করার দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি আহ্বান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিপিবি ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবু তোয়াব অপু।' 'রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের ঘোষণার এক দশক পেরিয়ে গেলেও একটা সাইনবোর্ড-ব্যানার পর্যন্ত দিতে পারেনি। প্রখ্যাত কৃষকনেতা ইলা মিত্রের ভিটামাটি অরক্ষিত থাকাকে প্রশাসনের গাফিলতি বলে উল্লেখ করেন বাগুটিয়া জরিপ বিশ্বাস ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুল ইসলাম।' বাগুটিয়ার রায়পাড়া
সংরক্ষণের রাষ্ট্রীয় সত্ত্বেও বেদখল ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়ি
নাচোলের রানিমা ইলা মিত্রের অরক্ষিত পৈত্রিক বাড়ি :
ঝিনাইদহের শৈলকুপা শহর থেকে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে ১৩ কিলোমিটার দুরের গ্রাম বাগুটিয়া। গ্রামের একপ্রান্তে কাঁচা রাস্তার পাশে চুন-সুড়কি দিয়ে গাঁথা ৯ রুমের পুরনো একটি দ্বিতল বাড়ি। এলাকার অধিকাংশ মানুষই জানেনা বাড়িটির ইতিহাস। শুধু জানেন হিন্দু সম্প্রদায়ের কারো ছিল, এখন সেখানে হাজী কিয়াম উদ্দিনের ছেলেরা বসবাস করেন। তারা কীভাবে বাড়িটি ভোগদখল করছেন তা জানেন না এলাকাবাসী। গ্রামের গুটিকয়েক মানুষ কেবল জানেন যে, ‘বাড়িটি কোনো এক বিপ্লবী মানুষের।’ সেই বিপ্লবী মানুষটি হচ্ছেন তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী, সংগ্রামী নারী ইলা মিত্র। শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামের এই বাড়িটি ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ি। ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে এই বাড়িটি দাঁড়িয়ে থাকলেও রয়েছে বে-দখল। ভেঙে পড়তে শুরু করেছে ইটের গাঁথনিগুলো। চওড়া দেয়ালে ঘেরা প্রাচীরের অনেক অংশ ভেঙে ফেলেছে দখলদাররা। শুধু বাড়ি নয়, দখল করা হয়েছে ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের রেখে যাওয়া শত শত বিঘা জমি। সরকারের খাতায় এগুলো ভিপি তালিকাভুক্ত হলেও বাস্তবে তা এলাকার প্রভাবশালীদের দখলে।
ইলা মিত্র অবিভক্ত ভারতের কিংবদন্তী বিপ্লবী। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের চাকরীর সুবাদে তাঁর জন্ম কলকাতায়। ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহন করেন। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বেঙ্গলের ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। মা মনোরমা সেন গৃহিনী। ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রাম তাদের পৈত্রিক নিবাস। ইলা মিত্রের জন্ম কলকাতায় হলেও ছোট বেলায় তিনি বেশ কয়েকবার বাগুটিয়া গ্রামে এসেছেন। ১৯৪৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুরের জমিদার বাড়ির রমেন্দ্রনাথ মিত্রর সঙ্গে ইলা সেনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তার নাম হয় ইলা মিত্র।
ইলা মিত্র তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে অর্থাৎ ১৯৪৩ সাল থেকে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ১৯৪৮ সালে ৬ মার্চ এদেশের জন্য পৃথকভাবে কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠিত হলে ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চাপাইনবাবগঞ্জের নাচোল অঞ্চলে তেভাগা দাবিতে কৃষকদের নেতৃত্ব দেন। যা ইতিহাসে নাচোল বিদ্রোহ নামে পরিচিত পেয়েছে। ১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায়িক দাঙ্গা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার সর্বত্র। ইলা মিত্র কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নোয়াখালীর দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় সেবা ও পুনর্বাসনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ইলা মিত্র আত্মগোপন অবস্থায় ১৯৪৮-৪৯ সালে নাচোল কৃষকদের ফসলের দাবিতে ‘ তেভাগা আন্দোলন’ এর ডাক দেন এবং কৃষকদের ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ান। এই আন্দোলনের সময় তার উপর পুলিশের অমানবিক নির্যাতন চলে। 'পাকিস্তানি ইনজেকশন' নামে কুখ্যাত নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যৌনাঙ্গের গরম ডিম দেয়, চুল টেনে ছিঁড়ে ও ধর্ষণের মতো পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে কলকাতায় চলে যান। এরপর তিনি কলকাতার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও গনতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তিনি কলকাতার মানিকতলা নির্বাচনী এলাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে তিনি কলকাতা সাউথ সিটি কলেজের বাংলা সাহিত্যে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। পাশাপাশি কলকাতার সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠনের কাজ করতে থাকেন। মেধা ও নেতৃত্বের গুনে তিনি ধাপে ধাপে উপরে উঠতে থাকেন। বিধান সভায় ডেপুটি লিডার হন। ১৯৬২ সাল থেকে শিক্ষক প্রতিনিধি হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট মেম্বার নির্বাচিত হন পাঁচবার।
সরেজমিনে ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরনো আমলের নিদর্শন চুন-সুড়কির তৈরী দ্বিতল বাড়িতে বসবাস করছেন হাজি কিয়াম উদ্দিনের তিন সন্তান। বড় ছেলে আলী হোসেন জানান, 'তারা বাগুটিয়রা ১১৬ নং মৌজার ২৩৪৫ দাগের জমির উপর বাড়িটি সহ ৮৪ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। বাবা হাজি কিয়াম উদ্দিন বহু পূর্বে ইলা মিত্রের বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের শ্বাশুড়ি সরোদিনী সেনের কাছ থেকে এই জমি কিনে নেন। সরোদিনি সেন কিভাবে এই জামির মালিক হলেন তা তিনি বলতে পারেন না বলে জানান। তিনি ছাড়াও তার ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম, আব্দুর রশিদ ও রাশিদুল ইসলামের পরিবার এখানে বসবাস করেন। মূল ঘরটির ৫ টি রুম ব্যবহার করা যায়। ভাইয়েরা সেগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বাকি রুমগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
কিংবদন্তী নারী ইলার শৈশব কৈশর সময় পার করা বাগুটিয়া, গোপালপুর, শেখরা, রঘুনন্দপুর, শাহাবাজপুর সহ কয়েকটি গ্রামে। তার বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন, মা মনোরমা সেন এবং পিতামহ রাজমোহন সেনের নামে রয়েছে কয়েকশ বিঘা জমি। এসব ভিপি সম্পত্তি হিসাবে সরকারী খাতায় থাকলেও তার সবটুকুই এখন বে-দখল। তবে ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা জানান এসব সম্পত্তির ব্যাপারে সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি ও দুই শতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।
ইলা মিত্রের পরিবার সম্পর্কে ওই গ্রামের বাসিন্দা জানান, 'তারা শুনেছেন নগেন্দ্রনাথ সেন নামে এক ব্যাক্তি তাদের এলাকার ছোট-খাটো জমিদার ছিলেন। বাগুটিয়াসহ পাশ্ববর্তী কয়েকটি মৌজায় বাবা নগেন্দ্রনাথ সেনের অঢেল জমি-জিয়ারত ছিল। যা বর্তমানে এলাকার প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। হাজি কিয়াম উদ্দিন ছাড়াও জনৈক আমিনুল ইসলামের দখলে রয়েছে ওই নগেন্দ্রনাথ সেনের সিংহভাগ জমি। তবে তিনি যে ইলা মিত্রের বাবা ছিলেন এটা তারা জানতেন না। তার দাবি, বাড়িটি যদি ইলা মিত্রের হয় তাহলে এটি সংরক্ষণ করা জরুরী। তার মতে, এটা রক্ষা হলে এক কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস রক্ষা হবে। বাগুটিয়া গ্রামের ইলা মিত্রের পৈত্রিক বাড়ী ও সম্পদ রক্ষণাবেক্ষন করা উচিত।'
ইলা মিত্র ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। এমাসে কাছাকাছির সময়ে জন্ম ও মৃত্যু দিবস হলেও নেই কোন আয়োজন রাষ্ট্রীয়ভাবে। নেই জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে কোন কর্মসূচি। প্রতিবছর নানাবিধ কর্মসূচি থাকলেও ঝিনাইদহ তথা বিশ্বখ্যাত লিজেন্ড ইলা মিত্রের কর্মসূচি সম্পর্কে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক বলেন, ইলা মিত্রের বাড়ি সংরক্ষণের বিষয়টি অবগত। প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিবেন বলে জানান। গণমাধ্যমের কাছে এমন কথা বরাবরই দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ বললেও কাজের বাস্তবায়ন বিন্দুমাত্র নেই। ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার বাগুটিয়া রায়পাড়ায় বাড়িটি অবস্থিত। ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত এই বাড়িটি বর্তমানে একজন বিশেষ ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ইলা মিত্রে বাড়ি
অবস্থান হল-বাগুটিয়া, শৈলকুপা উপজেলা, ঝিনাইদহ জেলা, বাংলাদেশ মোতাবেক স্থানাঙ্ক-
২৩.৬০০৫২৪১° উত্তর ৮৯.২৭৮৭৩৬২° পূর্বে বাসস্থান হিসেবে নির্মাণের করেছিলেন বনেদি পরিবারটি। বর্তমানে কালের সাক্ষী এ বাড়িটিকে পুরাকীর্তি ও প্রত্মসম্পদ একইসাথে বিপ্লবী ইলা মিত্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকার সংরক্ষিত স্থান ঘোষণা করেছে।
২০১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে উপ-সচিব মোঃ মকবুল হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার বাগুটিয়া (রায়পাড়া) গ্রামের ইলা মিত্রের পৈতৃক বাড়িটি প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৬৮ সালের (সংশোধিত ১৯৭৬) পুরাকীর্তি আইনে সংরক্ষণ উপযোগী।
ব্রিটিশবিরোধী ও তে-ভাগা আন্দোলের নেত্রী ইলা মিত্রের পৈত্রিক ভিটা অধিগ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঝিনাইদহের শৈলকুপার বাগুটিয়া গ্রামে তার পৈত্রিক ভিটা।
বিগত ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় পুরাকীর্তি হিসেবে বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য গেজেট প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পত্র সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ইলা মিত্রের স্মৃতি রক্ষা আন্দোলন:
ঝিনাইদহ ও শৈলকুপায় ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ইলা মিত্র পৈত্রিক বাড়ি ও স্মৃতি রক্ষা আন্দোলন সফভাবে সংগঠিত হয়। ইলা স্মৃতি রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক ও জন্মশতবর্ষ উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক সুজন বিপ্লব বিপ্লব এই প্রতিবেদকে বলেন, 'সারা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি নিপীড়ণের শিকার রাজনীতিবিদ হলেন ইলা মিত্র। কমরেড ইলা মিত্র ভারত ও বাংলাদেশ-উভয় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা'য় স্বীকৃত হয়েছে। উপমহাদেশের মানুষের ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠায় সারাজীবন লড়াই করলেও আজ নিজের পিতৃভূমি-বাড়িসহ জমাজমি সবটুকুই অরক্ষিত। বাড়িটির বর্তমান বাসিন্দাদের অন্যত্র পুনর্বাসন করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসাবে অবিলম্বে ইলা মিত্রের বাবার বাড়ি সংরক্ষণের দাবি ঐতিহাসিক প্রয়োজন। যোগ্য দেশপ্রেমিক ও মানবিক প্রজন্ম গড়তে সমৃদ্ধ ইতিহাসের পাঠ দিতে নাচোল বিদ্রোহের রানিমা ইলা মিত্রকে অবশ্যই ধারণ করা জরুরি।'
নাচোলে কমিউনিস্ট বিপ্লবী ইলা মিত্র:
নাচোল বিদ্রোহ ছিল ১৯৪৯-১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল অঞ্চলে সংঘটিত একটি কৃষক বিদ্রোহ, যা মূলত তেভাগা আন্দোলনের অংশ ছিল এবং ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সাঁওতাল ও অন্যান্য কৃষকদের নিয়ে গড়ে ওঠে। এটি ছিল আধিয়ার কৃষকদের একটি অভ্যুত্থান এবং এর মূল লক্ষ্য ছিল কৃষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
ইলা মিত্রের নেতৃত্বে তেভাগা সংগ্রাম হলেও তিনি তেভাগা আন্দোলন নয় প্রকৃতপক্ষে নাচোল কৃষক বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেত্রী ইলা মিত্র ছিলেন নাচোল বিদ্রোহের অবিসংবাদিত সংগঠক। তেভাগা আন্দোলন ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর -এ শুরু হয়ে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত চলে। বর্গা বা ভাগ-চাষীরা এতে অংশ নেয়। মোট উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগের দুইভাগ পাবে চাষী, এক ভাগ জমির মালিক- এই দাবি থেকেই তেভাগা আন্দোলনের সূত্রপাত। আগে বর্গাপ্রথায় জমির সমস্ত ফসল মালিকের গোলায় উঠত এবং ভূমিহীন কৃষক বা ভাগ-চাষীর জন্য উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক বা আরও কম বরাদ্দ থাকত। যদিও ফসল ফলানোর জন্য বীজ ও শ্রম দু'টোই কৃষক দিত। তৎকালীন পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিমবঙ্গে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়। তবে দিনাজপুর ও রংপুর, খুলনা, যশোর, নড়াইলে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিল।
তেভাগা ১৯৪৬-৪৮, নাচোল বিদ্রোহ ১৯৪৯-৫০- সময়কালই আলাদা হলেও তেভাগা আর নাচোল বিদ্রোহ পরিপূরক হলেও নাচোল কৃষকের এক অগ্নিগর্ভ আন্দোলনে গোটা পৃথিবীকে আলোড়িত করে। তবে তেভাগা আন্দোলনের অনুরণন ও একই দাবিতে নাচোল বিদ্রোহ হয়। তাই নাচোল কৃষক বিদ্রোহ ইতিহাসে স্বতন্ত্র ও কৃষকজনগণ ও আদিবাসী সাঁওতালদের রক্তস্রোতের অনন্য অধ্যায়।
ইলা মিত্র বাড়ি সংরক্ষণে বিশিষ্টজনের দাবি:
'ঐতিহাসিক নাচোল বিদ্রোহের কিংবদন্তি কমরেড ইলা মিত্র'র পৈত্রিক বাড়ি সংরক্ষণ, নাচোল কৃষক আন্দোলনের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশসহ বিচারিক রায়কে অবৈধ ঘোষণা, পাঠ্যপুস্তকে জীবনী সংযোজন, ইলা মিত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, কেসি কলেজ ছাত্রীনিবাস ও সড়ক নামকরণের গণদাবি অবিলম্বে বাস্তবায়ন করার দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচি আহ্বান করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিপিবি ঝিনাইদহ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবু তোয়াব অপু।' 'রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের ঘোষণার এক দশক পেরিয়ে গেলেও একটা সাইনবোর্ড-ব্যানার পর্যন্ত দিতে পারেনি। প্রখ্যাত কৃষকনেতা ইলা মিত্রের ভিটামাটি অরক্ষিত থাকাকে প্রশাসনের গাফিলতি বলে উল্লেখ করেন বাগুটিয়া জরিপ বিশ্বাস ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুল ইসলাম।'
© Deshchitro 2024