|
Date: 2025-10-18 03:51:04 |
শাহিন মোল্লা
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে।”
এই একটিমাত্র পংক্তিতেই লুকিয়ে আছে লালন ফকিরের দর্শন, তাঁর জীবনদৃষ্টি, তাঁর মানবতাবাদ।
আজ লালন সাঁইজির ১৩৫তম তীরোধান দিবস। প্রতিবছর আশ্বিনের শেষ ও কার্তিকের প্রথম ভাগজুড়ে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়িতে জড়ো হন লাখো মানুষ — বাউল, ফকির, সাধক, গবেষক, শিল্পী ও দর্শনার্থী। কারও হাতে একতারা, কারও কণ্ঠে “খাঁচার ভেতর অচিন পাখি।
সব মিলিয়ে ছেঁউড়িয়া পরিণত হয় এক অনন্য মানবতার মেলায়।
লালন ছিলেন জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ বৈষম্যের ঊর্ধ্বে একজন মহান মানবতাবাদী।
তাঁর গানে বারবার ফুটে উঠেছে মানুষ চেনার আহ্বান
মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
তিনি বলেছিলেন, মানুষই ধর্মের মূল, মানুষই সাধনার পথ।
লালনের মতে, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান নয়, ভেতরের সত্যই আসল সাধনা।
ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি: বাউল সাধনার পীঠস্থান
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়া গ্রামে অবস্থিত লালন আখড়াবাড়ি আজ শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়; এটি মানবতার এক জীবন্ত প্রতীক।
তীরোধান দিবসে এখানে বসে লালন মেলা — চলে তিন দিনব্যাপী বাউল গান, আলোচনা, লালন ভাবগীতি, দর্শনচর্চা, আর সারারাতের আখড়ার আসর।
এই আখড়ায় লালনের শিষ্যরা আজও গেয়ে যান তাঁরই বানী
ধর্মের কাহারে কয়, মনই তো ধর্ম আমার।
লালনের গানে শুধু আধ্যাত্মিক তত্ত্ব নয়, রয়েছে সমাজচেতনা।
তিনি এক অন্ধকার সময়ে মানুষকে মুক্তচিন্তার আলো দেখিয়েছিলেন। তাঁর প্রভাব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক মানবতাবাদী ভাবনায়ও বিদ্যমান।
বাংলাদেশসহ পৃথীবির বিভিন্ন দেশে লালনচর্চার পরিসর বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লালনের দর্শন নিয়ে গবেষণা চলছে, শিল্পীরা তাঁর গান নতুনভাবে পরিবেশন করছেন, আবার তরুণ প্রজন্মও লালনের সহজিয়া দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে।
বর্তমান সমাজে যখন ধর্ম ও রাজনীতির বিভাজন বাড়ছে, তখন লালনের ভাবনা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—
মানুষের আগে মানুষ, ধর্ম নয়।
তাঁর তীরোধান দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় সহনশীলতা, ভালোবাসা ও আত্মচেতনার বার্তা।
লালন ফকির নেই, কিন্তু তাঁর গানে আজও শোনা যায় মানবতার ডাক।
এই তীরোধান দিবসে আমরা যেন তাঁর সেই অনন্ত বানী হৃদয়ে ধারণ করতে পারি
মানুষ ভজলে সোনারমানুষ হবি।
ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ি আজও বলে লালন বেঁচে আছেন তাঁর গানে, তাঁর দর্শনে, প্রতিটি মানব হৃদয়ে।
© Deshchitro 2024