|
Date: 2025-12-01 17:12:05 |
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন
চন্দনাইশ উপজেলা সদরের একটু আগে অবস্থিত দ্বীনি শিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান জোয়ারা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসার দক্ষিণ পাশে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে “মাওলানা মনজিল”—যা আজ এক পবিত্র ঐতিহ্যের প্রতীক। এই মনজিলের প্রবেশপথেই অবস্থিত এক শান্ত-নিবিড় কবরস্থান, যেখানে শায়িত আছেন চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা ও মানবকল্যাণের উজ্জ্বল নক্ষত্রগণ। তাঁদের জীবনের লক্ষ্য ছিল দ্বীন প্রতিষ্ঠা, সমাজের কল্যাণ এবং মানুষের হৃদয়ে আলোর সঞ্চার।
মুফতি পরিবারের ঐতিহ্য: বার আউলিয়া স্মৃতিবিজড়িত চন্দনাইশ উপজেলার বিখ্যাত আলেম পরিবার ও জাতীয় ব্যক্তিত্বের জন্য “মুফতি পরিবার” সুপরিচিত। এই পরিবারের নামানুসারেই পাড়াটির নাম হয়েছে “মাওলানা মনজিল”। মুফতি সাহেবের ৯ পুত্র ও ৫ কন্যা—সকলেই দ্বীনি শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন এবং দেশ-জাতির কল্যাণে আজীবন কাজ করেছেন। তাঁদের ঘর থেকে জন্ম নিয়েছে বহু শিক্ষাবিদ, মুহাদ্দিস, গবেষক ও সমাজসংস্কারক, যাঁদের ত্যাগ-দীক্ষায় সমৃদ্ধ এই অঞ্চল আজও দীপ্তমান।
আলোকিত মহাপুরুষদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
১. আলহাজ্ব মুফতি মাওলানা শফিউর রহমান (রহ:) : (জন্ম: ১ জানুয়ারি ১৯০৪ – ওফাত: ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ / ৬ রমজান ১৪১৫ হি.)
প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ, জোয়ারা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। তিনি ছিলেন এক দীননিষ্ঠ শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক, যিনি ইসলামী শিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তুলেছেন। তাঁর হাতেই এই মাদ্রাসা দক্ষিণ চট্টগ্রামের ধর্মীয় শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।
২. আলহাজ্ব মাওলানা মাহমুদুর রহমান (রহ:): (ওফাত: ৮ মার্চ ২০০৫ / ২৫ মহররম ১৪২৬ হি.)
সাবেক অধ্যক্ষ, জোয়ারা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। পিতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি জ্ঞানচর্চা, প্রশাসন ও নৈতিক নেতৃত্বে মাদ্রাসাটিকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেন।
৩. মাওলানা মাহফুজুর রহমান (রহ:) : (ওফাত: ৩০ মে ২০২৩)। সাবেক ইমাম, খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ খান জামে মসজিদ। তাঁর কণ্ঠে কিরাত ও খুতবা ছিল দীনপ্রেমের মর্মবাণী। বিনয়, সততা ও মানবসেবায় তিনি ছিলেন অনুকরণীয় আলেম।
৪. শায়খুল হাদিস আল্লামা অধ্যক্ষ ফখরুদ্দীন (রহ:) : (জন্ম: ১ মার্চ ১৯৪৯ – ওফাত: ২৬ মে ২০১১)। সাবেক মুহাদ্দিস, মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা; সাবেক অধ্যক্ষ, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা। তিনি কর্মজীবন শুরু করেন চট্টগ্রাম ছোবহানিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে। তাঁর ওস্তাদ পীরে কামেল হযরত শাহ হাবীব আহমদ (রহ:)–এর আহ্বানে চুনতী হাকীমিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় অবসর জীবনে শেষ বয়েসেও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
৫. মাওলানা মুহাম্মদ আলাউদ্দীন (রহ:) (ওফাত: ১৯ জুলাই ১৯৯৮)। শায়খুল হাদিস, ছোবহানিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম। তাঁর শিক্ষা ও দীক্ষায় বহু প্রজন্ম হাদিস, ফিকহ ও আধ্যাত্মিকতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে। তিনি একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদও ছিলেন। এই রচনার লেখক তাঁর স্নেহধন্য।
৬. আলহাজ্ব মাওলানা মুহাম্মদ বোরহান উদ্দীন (রহ:): (ওফাত: ৩০ আগস্ট ২০১৯)। প্রধান মাওলানা, পাহাড়তলী রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। তিনি সাধারণ ও ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়ে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।
৭. অধ্যক্ষ আল্লামা আমিনুর রহমান (রহ:):(জন্ম: ১ মার্চ ১৯৬৫ – ওফাত: ৬ ডিসেম্বর ২০২২)। খলিফায়ে দরবারে আ’লা হযরাত (ভারত), বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও অনুবাদক ছিলেন। তাসাউফ, ইসলামী দর্শন ও আহলে সুন্নাত চিন্তায় তিনি রেখে গেছেন অমর দৃষ্টান্ত। তাঁর কলম ও চরিত্র “মাওলানা মনজিল”-এর ঐতিহ্যকে করেছে আরও গৌরবান্বিত। তিনি জোয়ারা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন।
“মাওলানা মনজিল”: ইসলামী চেতনার প্রতীক: “মাওলানা মনজিল পারিবারিক কবরস্থান” আজ কেবল আত্মীয়তার বন্ধন নয়—এটি ইসলামী চেতনা, জ্ঞানসাধনা ও নৈতিকতার এক অনন্ত প্রতীক। এখানে শায়িত প্রতিটি মহাপুরুষ প্রমাণ করেছেন— “ইলম ও আমলের সমন্বয়ে গড়া জীবনই চিরজীবী হয়।”
চন্দনাইশের এই পবিত্র ভূমি তাই প্রজন্মের পর প্রজন্মে ছড়িয়ে দিচ্ছে আলোর বাণী—
জীবনের পরও যাঁরা পথ দেখান, তাঁরাই সত্যিকার অর্থে ‘জীবনজয়ী মহাপুরুষ’। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌসের উচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।
তথ্যের উৎস: মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন — লেখক ও গবেষক , মাওলানা মনজিল, চন্দনাইশ। “চন্দনাইশের সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাস” গ্রন্থ অবলম্বনে।
লেখক : সোহেল মো. ফখরুদ-দীন,
সভাপতি, মুসলিম হিস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ।
পরিচালক, দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ।
© Deshchitro 2024