|
Date: 2025-12-24 00:40:45 |
◾মোঃ মনিরুল ইসলাম চৌধুরী : বাংলাদেশের রাজনীতি আজ কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আস্থাহীনতা, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক বিভাজনের এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত। রাজনৈতিক দল বদলায়, সরকার আসে–যায়, কিন্তু রাজনীতির আচরণগত সংস্কৃতি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে যায়। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—সমস্যার মূল কোথায়? উত্তরটি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে: কেবল রাজনৈতিক সংস্কার দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; প্রয়োজন একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
রাজনীতি সমাজেরই প্রতিফলন। সমাজে যদি যুক্তিবোধের চেয়ে আবেগ, সহনশীলতার চেয়ে বিদ্বেষ এবং নৈতিকতার চেয়ে সুবিধাবাদ প্রাধান্য পায়, তবে রাজনীতিও তার বাইরে থাকতে পারে না। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে অসহিষ্ণু ভাষা, প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ ও শক্তির প্রদর্শন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এই চক্র ভাঙতে হলে সমাজের চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধের ভেতরেই পরিবর্তনের সূচনা প্রয়োজন।
সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লব বলতে কোনো আকস্মিক বা সহিংস পরিবর্তন নয়; বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসরে যুক্তিবাদ ও মানবিকতার ধারাবাহিক চর্চাকেই বোঝায়। এই প্রক্রিয়া মানুষকে কুসংস্কার, গুজব ও আবেগপ্রবণতা থেকে বের করে এনে তথ্যভিত্তিক ও বিবেচনাপ্রসূত চিন্তার দিকে ধাবিত করে। নাগরিকরা তখন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে ন্যায়, যুক্তি ও জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিতে শেখে।
এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ে নাগরিক সচেতনতার ওপর। সচেতন নাগরিক অন্যায় ও দুর্নীতিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয় না। ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনের শাসন লঙ্ঘন কিংবা মানবাধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। ফলে রাজনীতিতে জবাবদিহির চাপ সৃষ্টি হয়, যা গণতন্ত্রকে কেবল আনুষ্ঠানিক নয়, কার্যকর রূপ দিতেও সহায়ক।
একই সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লব ভিন্ন-মতের প্রতি সহনশীলতা গড়ে তোলে। গণতন্ত্রে মতভেদ অনিবার্য, কিন্তু তা শত্রুতায় রূপ নেওয়া গণতান্ত্রিক ব্যর্থতারই লক্ষণ। ভিন্ন মতকে গ্রহণ করার মানসিকতা, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক ও শালীন ভাষার চর্চা রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস করতে পারে। এতে রাজনীতির পরিসর আরও সভ্য ও সংলাপনির্ভর হয়ে ওঠে।
সর্বশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনীতিকে সুস্থ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনৈতিক সংস্কার তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সমাজের মূল্যবোধগত পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বিত হবে। একটি সচেতন, সহনশীল ও নৈতিক সমাজই পারে একটি স্থিতিশীল ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ নির্মাণ করতে।
লেখক : মোঃ মনিরুল ইসলাম চৌধুরী
শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ,ঢাকা।
© Deshchitro 2024