মো: তুফান আহমেদ 


২০২৫ সাল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) জন্য ছিল এক শোকাবহ অধ্যায়। মাত্র ১০ মাসে অস্বাভাবিক ও অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে প্রাণ হারিয়েছেন সাতজন মেধাবী শিক্ষার্থী। একের পর এক এই মৃত্যুগুলো শুধু সংখ্যা নয়—প্রতিটি ছিল এক একটি স্বপ্নভঙ্গের গল্প, এক একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। ঘটনাগুলো শিক্ষার্থী ও অভিভাবকমহলে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও শিক্ষার্থী কল্যাণে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে।

বছরটি শুরু হয়েছিল মর্মবেদনার মধ্য দিয়ে এবং শেষ হয়েছে একই ধরনের করুণ ঘটনায়। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে আলাদা আলাদা পরিস্থিতি—কেউ মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছেন, কেউ অসুস্থতায় ঝরে গেছেন, আবার কেউ হয়েছেন সহিংসতার শিকার। কিন্তু সব মৃত্যুই একটি বিষয়ে মিলে যায়—এগুলো প্রতিরোধযোগ্য ছিল।

যে সাতজনকে হারাল জবি

সাবরিনা রহমান শাম্মী (সমাজবিজ্ঞান বিভাগ): ২৬ জানুয়ারি কাঠের পুল এলাকার মেসে ঝুলন্ত অবস্থায় মৃত পাওয়া যায় তাঁকে। পারিবারিক সম্পর্কে জটিলতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমস্যায় ভুগছিলেন সাবরিনা। প্রাণবন্ত এই তরুণী স্বপ্ন দেখতেন সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন। তাঁর মৃত্যু বছরের শুরুতেই ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া ফেলে।

হাবিব রিয়াদ (কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ): ১৭ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার নিজ বাড়িতে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। তিনবার পুনর্ভর্তি হয়েও একাডেমিক চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন রিয়াদ। প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ এই শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখতেন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হবেন। কিন্তু একাডেমিক ব্যর্থতার চাপ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাব তাঁকে এই চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।

মো. আহাদ হোসেন (ফিন্যান্স বিভাগ): ২৭ ফেব্রুয়ারি মেসে গামছা দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। বিভাগীয় শিক্ষকেরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে মানসিক হতাশায় ভুগছিলেন আহাদ। সহপাঠীরা বলেন, তিনি ক্লাসে কম আসতেন, একা থাকতেন বেশি। কিন্তু কোনো কাউন্সেলিং সেবা না থাকায় তিনি প্রয়োজনীয় সহায়তা পাননি।

প্রত্যাশা মজুমদার অথৈ (সংগীত বিভাগ, ২২): তাঁকেও মেসে ঝুলন্ত অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়। সংগীতপ্রেমী এই তরুণী ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তাঁর সহপাঠীরা বলেন, প্রত্যাশা স্বপ্ন দেখতেন সংগীত শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে কী সমস্যা ছিল, তা কাউকে জানাননি।

সানজিদা ইসলাম (ইতিহাস বিভাগ): ৮ অক্টোবর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নিয়মিত ক্লাসে আসতেন, পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন সানজিদা। তাঁর মৃত্যু বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও চিকিৎসা সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

হাসিবুর রহমান (জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের জবি শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক): ৪ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। রাজনীতিসচেতন এই শিক্ষার্থী ছিলেন সক্রিয় ছাত্র নেতা।

জোবায়েদ: ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর বংশাল এলাকার নূরবক্স রোডে টিউশনি করতে গিয়ে ছুরিকাহত হন। আহত অবস্থায় সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করার সময় তিনতলা থেকে পড়ে যান এবং ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে টিউশনি করতেন জোবায়েদ। তাঁর মৃত্যু শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলে।

একাডেমিক চাপ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব

বছরটিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল মানসিক চাপে আত্মহত্যার প্রবণতা। সাতজনের মধ্যে চারজনের মৃত্যুই ছিল আত্মহত্যা। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।

জবির একাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাম্পাসে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসা কেন্দ্র থাকলেও সেখানে কোনো মনোবিদ বা কাউন্সেলর নেই। শিক্ষার্থীরা মানসিক সমস্যায় ভুগলে কোথায় যাবেন, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, 'সাবরিনা আপুকে আমরা চিনতাম। দেখেছি মানসিক চাপে ভুগছিলেন। কিন্তু তখন বুঝিনি কতটা গভীর সেই সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি কাউন্সেলিং সেবা থাকত, হয়তো আপুকে হারাতে হতো না।'


মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য একটি উপেক্ষিত বিষয়। একাডেমিক চাপ, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক প্রত্যাশার বোঝা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।



শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি

বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠন এই মৃত্যুগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং জরুরি ভিত্তিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর দাবি জানিয়েছে।



তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই বলছেন, শুধু কমিটি আর পরিকল্পনা নয়, দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার। প্রতিটি দিন দেরি হওয়া মানে আরও ঝুঁকি বাড়া।

জবির হারানো সন্তানদের স্মরণে

সাবরিনা রহমান শাম্মী, প্রত্যাশা মজুমদার অথৈ, মো. আহাদ হোসেন, হাবিব রিয়াদ, সানজিদা ইসলাম, হাসিবুর রহমান এবং জোবায়েদ—এই সাত নাম এখন জবির ইতিহাসে দুঃখজনক এক অধ্যায় হিসেবে লেখা থাকবে। তাঁরা শুধু সংখ্যা নন, প্রত্যেকেই ছিলেন স্বপ্ন দেখা তরুণ প্রাণ। প্রত্যেকের পরিবারে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা। সেই স্বপ্নগুলো অপূর্ণ রয়ে গেল।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024