|
Date: 2026-02-21 11:17:29 |
একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ মানে ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গের অমর ইতিহাস। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাজপথে নামা ছাত্র-জনতার বুকের রক্তে রচিত হয়েছিল বাঙালির ভাষা অধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায়।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একভাষিক নীতির বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদ ধীরে ধীরে রূপ নেয় গণ-আন্দোলনে। ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর থেকেই ক্ষোভ জমতে থাকে। ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে মিছিল বের হলে পুলিশ গুলি চালায়। সেই গুলিতেই প্রাণ হারান ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদরা। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউরসহ নাম না-জানা শহিদদের আত্মদানে বাংলা ভাষা পেয়েছিল রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা, আর বাঙালি পেয়েছিল আত্মপরিচয়ের ভিত্তি।
এই আত্মত্যাগ শুধু ভাষার মর্যাদাই প্রতিষ্ঠা করেনি; বাঙালির জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ভিত্তিও রচনা করে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকেই জন্ম নেয় ছয় দফা, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ-একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন। শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গড়ে ওঠে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার, যা আজ বাঙালির চেতনার প্রতীক। প্রতিবছর একুশের প্রথম প্রহরে খালি পায়ে ফুল হাতে মানুষের ঢল নামে শহিদ মিনারে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি তখন হয়ে ওঠে শোক, গৌরব ও অঙ্গীকারের সম্মিলিত সুর।
১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিলে একুশের চেতনা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা, বিপন্ন ভাষা সংরক্ষণ এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরাই এই দিবসের মূল লক্ষ্য। বিশ্বজুড়ে বহু ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকায় মাতৃভাষার অধিকার এখন বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অংশ।
মহান ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়’ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে বলেছেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা আজ অনুপ্রেরণার অবিরাম উৎস।’ বাংলা ভাষার যথাযথ চর্চা ও মান সংরক্ষণে আরও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, মহান ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি, বরং বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিকে মজবুত ও সুদৃঢ় করেছে। তিনি বলেন, ‘একুশের চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ বাংলাদেশের ভাষাবৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সর্বস্তরে বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার ও চর্চা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
একুশে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি। এদিন দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। ভাষাশহিদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরতে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সব স্যাটেলাইট চ্যানেল ও গণমাধ্যমে একুশের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রকাশ করা হবে। দিনটি উপলক্ষে আজ শনিবার সকাল ৮টায় বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর। বেলা ১১টায় একাডেমির নজরুল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘অমর একুশে বক্তৃতা-২০২৬। ‘একটি স্কুল-মাসিক ম্যাগাজিন ছাত্র-সুহৃদর ইতিবৃত্ত’ শীর্ষক অমর একুশে বক্তৃতা প্রদান করবেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্। আজ সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছায়ানট মিলনায়তনে পাঠ, আবৃত্তি, সম্মেলক ও একক গানে ভাষাশহিদদের স্মরণ করবেন ছায়ানটের শিল্পীরা। আজ বেলা সাড়ে ৩টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুক্তমঞ্চে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের উদ্যোগে আলোচনা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
© Deshchitro 2024