|
Date: 2026-03-01 12:34:05 |
মধ্যপ্রাচ্যে আবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, অন্যদিকে ইরান। প্রথম আক্রমণটা করেছে যুক্তরাষ্ট্র গতকাল শনিবার সকালে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই যুদ্ধের সংবাদ দিয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, তারা বাইরের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধ শুরু করা সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে বড় যুদ্ধ অভিযান শুরু করেছে। আমাদের লক্ষ্য মার্কিন জনগণকে রক্ষা করা এবং ইরানি শাসকদের হুমকি বন্ধ করা।’ পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানও প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করে। তেহরানের এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান ভয়াবহ জবাব দেবে। সেই জবাব তারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দিয়েছে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে। শুধু ইসরায়েলে নয়, সংবাদমাধ্যমগুলো খবর দিয়েছে, ইসরায়েলের পর বাহরাইন, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও সৌদি আরবে শক্তিশালী বিস্ফোরণের পর আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। এসব দেশেই রয়েছে মার্কিন সেনা ও নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এই আক্রমণের মুখে দেশগুলো সতর্কতা জারি করে নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দেয়। বন্ধ হয়ে যায় বিমান চলাচল। সক্রিয় হয়ে ওঠে দেশগুলোর ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থা।
পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এর অভিঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সারা পৃথিবীতেই পড়বে। পৃথিবীর সব দেশে, বিশেষ করে ইউরো-মার্কিন বলয়ের বাইরের দেশগুলোতে কমবেশি নানা সংকট দেখা দেবে। গত কয়েক দিন ধরে পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। এতে আমাদের উপমহাদেশে চলছে চরম অস্থিরতা। এ রকম পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো আমাদের বিপন্ন করে তুলল। বিশ্বের জন্য ডেকে আনল সমূহ বিপদ। কিন্তু এই যুদ্ধের কোনো যৌক্তিকতা ছিল না।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান ১০ দিন ধরে যুদ্ধ করেছে। ইরানে হামলা চালানোর যুক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় বলে আসছে, ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ পারমাণবিক কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পরিদর্শনের মাধ্যমে এই কর্মসূচি যে হুমকি হয়ে উঠছে না, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। কীভাবে এটা করা যেতে পারে, এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। সর্বশেষ জুন-যুদ্ধের পর ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনায় ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরোনিয়ামের মজুত শূন্যে নামিয়ে আনতে রাজি হয়। এমনকি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনসহ যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র পরিদর্শক দলকেও পরিদর্শন করার অনুমতি দিতে চেয়েছে। ইরান বলেছে, তারা শুধু বেসামরিক কাজে পারমাণবিক পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিচ্ছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, চলতি সপ্তাহেই চুক্তিটি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গতকালের হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই কূটনৈতিক সমঝোতায় পানি ঢেলে দিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা আসলে কী, এটা এখন পরিষ্কার। হামলার লক্ষ্যও স্পষ্ট। ইরানের বর্তমান শাসকদের সঙ্গে চুক্তি করে তিনি তাদের শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে নারাজ। গতকালই হামলার মধ্যে ট্রাম্প যে কথা বলেছেন তাতে বোঝা যায়, ইরানের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসকের পরিবর্তনই তার লক্ষ্য। সেই পথেই তিনি এগোচ্ছেন। এবার বড় পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ইরানে হামলা চালিয়ে যাবে, তাও স্পষ্ট করে বলেছেন ট্রাম্প। কিন্তু এতে তিনি নিজের বিপদও ডেকে আনছেন। ইরান যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ চালাতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছে এই যুক্তি তুলে ধরে তিনি প্রতিবার ইরানে হামলা চালাচ্ছেন। কিন্তু এবার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনুকূল চুক্তিতে পৌঁছানোর মুহূর্তে যে হামলা চালালেন, তা মার্কিনিরা মেনে নেবেন বলে মনে হয় না। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বকে অস্থির করে তোলা, এমনকি আরও বড় আকারে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকছে। নিন্দার ঝড় উঠবে ইউরোপে, এমনকি আমেরিকাতেও।
যুদ্ধ আসলে কোনো সমাধান নয়। দ্রুত এই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটা উচিত। ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে যাওয়া উচিত আলোচনার টেবিলে। আমরা চাই বিশ্বে শান্তি বজায় থাকুক। যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো পরাশক্তি বা ইসরায়েলের মতো যুদ্ধবাজ কোনো দেশ বিশ্বে মানবিক বিপন্নতার কারণ হয়ে উঠুক, সেটা একেবারেই কাম্য নয়। আমরা তাই অবিলম্বে সব পক্ষকে এই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছি।
© Deshchitro 2024