|
Date: 2026-03-05 13:50:40 |
বাংলার গ্রাম-গঞ্জে গাছের ডালে ডালে জড়িয়ে থাকা সোনালি রঙের সূতার মতো যে লতাটি চোখে পড়ে, সেটিই স্বর্ণলতা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন প্রকৃতি নিজেই গাছের গায়ে বুনেছে সোনার জাল। সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এর বেঁচে থাকার এক অভিনব কৌশল।
স্বর্ণলতার নেই সবুজ পাতা, নেই শক্ত শিকড়। অন্য সাধারণ উদ্ভিদের মতো এটি নিজে খাদ্য তৈরি করতে পারে না। তাই জন্মের পরই এটি আশপাশের কোনো সবল গাছকে আঁকড়ে ধরে। সূক্ষ্ম শোষক অঙ্গের মাধ্যমে পোষক গাছের কাণ্ডে প্রবেশ করে সেখান থেকে সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় পুষ্টি। এভাবেই ধীরে ধীরে পুরো গাছটিকে জড়িয়ে ফেলে। উদ্ভিদবিদদের ভাষায়, এটি এক ধরনের বাধ্যতামূলক পরজীবী উদ্ভিদ। অর্থাৎ অন্য গাছ ছাড়া এর টিকে থাকা সম্ভব নয়।
আম, কাঁঠাল, লিচু কিংবা বিভিন্ন বনজ গাছে স্বর্ণলতার আক্রমণ দেখা যায়। আক্রমণ বেশি হলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, ডাল শুকিয়ে যেতে পারে, ফলন কমে যায়। ফলে কৃষকদের জন্য এটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকেই আক্রান্ত ডাল ছেঁটে ফেলে বা লতা সরিয়ে গাছ রক্ষা করেন। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের মতে, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত অপসারণই এর নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উপায়।
গ্রামবাংলায় স্বর্ণলতার আরেকটি পরিচয় আছে—ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবে। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এর রস চর্মরোগ, খুশকি বা চুল পড়া রোধে উপকারী। কিছু আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসাতেও এর ব্যবহার দেখা যায়। যদিও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আরও গবেষণার ওপর জোর দিচ্ছে, তবুও এর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
স্বর্ণলতার ঘন জট ছোট পাখি ও পোকামাকড়ের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। এভাবে এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের একটি অংশ হয়ে থাকে। প্রকৃতির চক্রে প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদেরই নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে—স্বর্ণলতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
স্বর্ণলতা একদিকে কৃষকের মাথাব্যথার কারণ, অন্যদিকে প্রাচীন ভেষজ জ্ঞানের সম্ভাবনাময় উপাদান। তাই একে কেবল ক্ষতিকর পরগাছা বলে অবহেলা না করে প্রয়োজন সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
হলুদ সূতার এই জাল তাই শুধু গাছের শরীরে জড়িয়ে থাকা লতা নয়; এটি প্রকৃতির এক নীরব বার্তা—টিকে থাকার সংগ্রাম, সহাবস্থান আর সম্ভাবনার এক অনন্য গল্প।
© Deshchitro 2024