আত্নশুদ্ধি, আত্নসংযম ও তাকওয়া অর্জনের মাস মাহে রমাদান। এ সময় মুমিন হৃদয়ে খেলে ইবাদতের ঢেউ। রমাদানের অন‍্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে সালাতুত তারাবী। এ সময় হাফেজে কুরআনদের মূখে উচ্চারিত ঐশী বাণীর সুললিত কন্ঠের তিলাওয়াতে মসজিদগুলো মূখরিত থাকে। আজকের আয়োজনে ঢাকা কলেজের ১৩ জন হাফেজ শিক্ষার্থীর এ বছর খতমে তারাবীহ পড়ানোর অনুভূতি,অভিজ্ঞতা ও আনুষঙ্গিক তুলে ধরেছেন দৈনিক দেশচিত্র


◼️হাফেজ জহির রায়হান : ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী তারাবীহ পড়াচ্ছেন ঝিনাইদহ সদরের মধুপুর পশ্চিম পাড়া জামে মসজিদে। তারাবীর অনুভূতি সম্পর্কে তার থেকে জানতে চাইলে তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন , কুরআন নাজিলের মাস মাহে রমাদ্বান। এ সময় কুরানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে মুমিন হৃদে এক শান্তির আবহ বিরাজ করে মসজিদগুলো মূখরিত হয় হাফেজদের সুললিত কন্ঠের তেলাওয়াতে। একজন হাফেজ হিসেবে এই মাসে ইবাদত ও তিলাওয়াতে অনেক বেশি তৃপ্তি অনুভব করি। রবের কাছে আমার ফরিয়াদ,যেন তার সন্তুষ্টি মোতাবেক জীবনটাকে পরিচালনা করার তাওফিক দান করেন( আমিন)


হাফেজ মাহমুদুল হক হাসান : ঢাকা কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের স্নাতকোত্তর এই শিক্ষার্থী জিপিইউএফপি (সারকারখানা) জামে মসজিদ, নরসিংদীতে তারাবীহ পড়াচ্ছেন। তার কাছে তারাবী পড়ানোর অনুভূতি ও মাহে রমাদান কিভাবে কাটছে জানতে চাইলে তিনি জানান, মাহে রমাদানকে বলা হয় ইবাদতের বসন্তকাল। ধর্মপ্রাণ, ক্ষমাপিপাসু মুসলমানগণ এই মাসের অপেক্ষায় থাকে বাকী ১১মাস। বিশেষত হাফেজ সাহেবগণ ফজিলতপূর্ণ এই মাসের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে প্রহর গুণে। আসলে তারাবী পড়ানোর অনুভূতি বলে বা লিখে প্রকাশ করার মতো না। তারাবীহ হচ্ছে আবেগ,ভালোলাগা ও ভালোবাসার একটা বিশেষ জায়গা যেখানে তিলাওয়াতের মধ‍্য দিয়ে হাফেজগণ এক পরম তৃপ্তি অনুভব করেন। আমার কাছে রমজানের প্রতিটা মহুর্তই উপভোগ‍্য মনে হয়।নামাজ, জিকির,সাহরী,ইফতার বিশেষকরে সালাতুত তারাবী, কিয়ামুল লাইল কোনটাই কোনটার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মহান রবের দরবারে অযুত-নিযুত শুকরিয়া যে, তিনি আমাকে বছরের এই সময়টাতে দুনিয়ার সকল কর্মব‍্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে তার সন্তুষ্টির উদ্দেশ‍্যে একান্তে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ করে দেন। মুসল্লীদের হৃদয় নিঙরানো ভালোবাসায় আপ্লুত হয়েছি বহুবার। কুরআনকে আমৃত‍্যু বুকে ধারণ করে তার শিক্ষা ও নির্দেশানুযায়ী আমল করতে পারি তার জন‍‍্য সকলের কাছে দোয়ার মোহতাজ।


হাফেজ ফারওয়াহ মুহতাদী রাহিব : হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী তারাবীহ পড়াচ্ছেন লালমাটিয়া কলোনী স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদ, আসাদগেইট ঢাকায় । তারাবীহ পড়ানোর অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাহে রমজানের একটি বিশেষ আমল হচ্ছে তারাবীহ। আল্লাহ তায়ালার কাছে অনেক অ নেক কৃতজ্ঞতা যে, তিনি আমাকে এই বিশেষ আমলের একজন খাদেম হিসেবে কবুল করেছেন। দোয়া চাই যেন আমৃত‍্যু কুরআনের খেদমত করে যেতে পারি।


হাফেজ মাহদীউজ্জান মাহমুদ : দর্শন বিভাগের এই শিক্ষার্থী ফরিদপুর সদরের কোমরপুর মিয়াবাড়ি জামে মসজিদে তারাবী পড়াচ্ছেন। তিনি বলেন একজন হাফেজে কুরআন হিসেবে নিজেকে সবসময় গর্বিত বোধকরি আর রমজানে খতমে তারাবী পড়ানো টা হাফেজদের জন‍্য একটা সৌভাগ্যের বিষয়। এবিশেষ নেয়ামত দান করার জন‍্য রাব্বে কারীমের প্রতি অশেষ শুকরিয়া।


হাফেজ হুসাইন বিন আসাদ: ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২২/২৩ সেশনের এই শিক্ষার্থী তারাবীহ পড়াচ্ছেন এস কে ভিলা পাঞ্জেগানা মাসজিদ,খিলগাঁও,ঢাকায়। তিনি তারাবী পড়ানোর অনুভূতি সম্পর্কে বলেন, হিফজ শেষ করেছি ২০১৩ সালে তারপর থেকে প্রায় প্রতিবছর তারাবীহ পড়াচ্ছি। মাঝে একবছর পড়াইনি তখন মনে হতো রমজান মাসে কত অলস হয়ে পড়ে আছি, প্রায় একঘেয়েমি চলে আসতো। তারাবীহ পড়ালে সারাদিন কুরআন পড়া হয়, এতে মন ও ব্রেন সবসময় সতেজ থাকে। অন্যদিকে মুসল্লিদের সাথে এক মাসের মোহাব্বত তৈরী হয়। অনেকেই নামাজের পরে মুসাফাহা করতে আসেন, আল্লাহর কালামের জন্য তারা হাফেজ সাহেবদের সম্মান করেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই খেদমতকে কবুল করুন।


হাফেজ মো: আব্দুল হাই: ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের এই শিক্ষার্থী চাঁদপুর বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তারাবীহ পড়াচ্ছেন। তার কাছে তারাবীর অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, রমজান একটি বরকতময় ও ফজিলত পুর্ন মাস। রমজান মাসে খতমে তারাবি পড়ানো বড় একটি চ্যলেঞ্জের বিষয়। এছাড়াও রমজানে নামাজে কুরআন তেলাওয়াতে মনের মধ্যে প্রশান্তি বিরাজ করে।


হাফেজ তুহিনুল ইসলাম : ইংরেজি বিভাগের ২২-২৩ সেশনের এই শিক্ষার্থী মোতালেব টাওয়ার, হাতিরপুল, ঢাকায় তারাবীহ পড়াচ্ছেন। তিনি তারাবী পড়ানোর অনুভূতি সম্পর্কে বলেন, রমজান মাস কোরআনের মাস। তাই এ মাসে পবিত্র কোরআন চর্চা করতে পারাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। দীর্ঘ ৬ বছর পরে আবার খতম তারাবি পড়ানোর অনুভূতিটা বলে বুঝানোর মত না। কোরআনের মাসে কোরআন চর্চা করতে পারাটা অন্তরে যেন প্রশান্তির পূর্ণতা ছড়িয়ে দেয়। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর এতটুকু অনুগ্রহের জন্য লাখো কোটি শুকরিয়া জানাই।


হাফেজ মোঃ মাসুম বিল্লাহ: ইংরেজি 

বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের এই শিক্ষার্থী ভান্ডারী মোড়, কামরাঙ্গীরচর ঢাকায় তারাবীহ পড়াচ্ছেন।

রমজানে তারাবী পড়ানোর অনুভুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 

রমজান নিয়ে আসে মুমিন জীবনে অনাবিল শান্তি সুখ, খোদার রহম নিয়ে গুনাহ মাফের আশায় বাধি বুক। 

রমজানে তারাবী পড়াতে দাড়ালেই কেমন জানি এক স্বর্গীয় সুখ অনুভুত হয়। কখনো আয়াতের মাঝে খোদার রহম পাওয়ার প্রবল আশা জাগে।আবার যখন জাহান্নাম বা আজাবের আয়াতগুলো আসে তখন অন্তর কেঁপে উঠে । সর্বোপরি কুরআন তেলাওয়াতে এক স্বাদ অনুভব করি। মনে হয় যেনো আল্লাহর খাস রহমত খাস সময়ে ঝড়ে পড়তেছে। মহান আল্লাহ রমজানের ন্যায় আমাদেরকে সারা বছর ইবাদতময় জীবন গঠনের তাওফিক দান করুক আমিন।


◾হাফেজ জোনায়েদুল ইসলাম : ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী তারাবীহ পড়াচ্ছেন ভিক্টর লাইফস্টাইল মসজিদ, সিদ্ধিরগঞ্জে। তারাবীহ পড়ানোর 

অনুভুতি সম্পর্কে তিনি জানান, একজন হাফেযের কাছে তারাবিতে কুরআন খতম করার আনন্দ অপরিসীম। এটা ভাষায় প্রকাশ করার মত না। আল্লাহ যেন সুস্থতার সাথে পুরো জীবন কুরআনের এই খেদমত করার তাওফিক দান করেন । আমিন।


হাফেজ আব্দুল্লাহ আত তাকি : ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের ২২/২৩ সেশনের এই শিক্ষার্থী তারাবীহ পড়াচ্ছেন 

রওশন মঞ্জিল, বাঘমারা সিদ্ধিরগঞ্জে। তিনি তার তারাবীহ পড়ানোর অনুভূতি 

সম্পর্কে জানান, হাফেজ হওয়ার পর তারাবীহ পড়ানোর মতো আনন্দ পৃথিবীর অন্য কোন কাজে পাওয়া না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই খেদমতকে দ্বীনের জন্য কবুল করুন আমীন।



হাফেজ ওয়ালিউল্লাহ হাসান: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এই শিক্ষার্থী তারাবীহ পড়াচ্ছেন রাজধানীর মগবাজার ওয়্যারলেস পান্জেগানা মসজিদে। তারাবীর অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, রমজান মাসকে ঘিরে প্রস্তুতি ও ব্যস্ততা অন্য সবার চেয়ে একটু বেশিই থাকে কুরআনের হাফেজদের। ইফতারের পরে যখন সবাই সারাদিনের ক্লান্তি অপসারণে কিছুটা বিশ্রাম নেয়, ঠিক তখনই হাফেজে কুরআনদের সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকতে হয়। কেননা কিছুক্ষণ পরই যে তাকে মহান দায়িত্ব সালাতে দাঁড়িয়ে নির্ভুলভাবে কুরআন শুনাতে হবে ।

তবে এত কিছুর পরও আমার কাছে খতমে তারাবী না পড়ালে মনে হয় যেন রমাদান আমার কাছে আসেই নাই । তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ মানুষ মনে হয়।

তাই আমার কাছে মনে হয়, রমাদান ও ঈদের প্রকৃত আনন্দ সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন কুরআনের হাফেজরাই।


হাফেজ জুবায়ের হুসাইন: ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের স্নাতকোত্তর এই শিক্ষার্থী মসজিদে রাহমান,মিশরে তারাবীহ পড়াচ্ছেন। তার তারাবীহ পড়ানোর অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে হাফেজদের কাছে রমজান ও তারাবীহ একটা আবেগ। এর সত্যিকারের অনুভূতি আসলে বলে বুঝানো যাবে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনের এই খেদমতে আমাকে কবুল করুন আমীন।


হাফেজ তাওহীদ নাবিল: ইসলাম শিক্ষা বিভাগের এই শিক্ষার্থী তারাবীহ পড়াচ্ছেন রসুলবাগ জামে মসজিদ আজিমপুর ঢাকায়। তার কাছে তারাবীহ পড়ানোর অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, আল্লাহর খাস রহমত ও অনুগ্রহ যে তিনি কুরআনের হাফেজ হিসেবে আমাকে কবুল করেছেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় রমজানে তারাবীহ পড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। তারাবীহ পড়ানোর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সকল কুরআনের হাফেজদেরকে দ্বীনের জন্য কবুল করুন আমিন।।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024