ভোরবেলা স্টোভের নীল শিখা থেকে শুরু করে গভীর রাতে মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকের গর্জন-বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতিটি স্পন্দন আজ জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে কালো মেঘের সৃষ্টি করেছে, তা যেন সহজে কাটছেই না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোল আর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় বিশ্ববাজার যখন টালমাটাল, তখন বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে-এই সংকটের মেঘ কি আদৌ কাটবে? বৈশ্বিক অস্থিরতা আমদানিনির্ভরতার সংকট-জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতা কেবল কোনো অর্থনৈতিক সমীকরণ নয়, এটি এখন একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। ওপেকের (OPEC) উৎপাদন হ্রাসের সিদ্ধান্ত এবং লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ তার চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি তেলই বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য বাড়লে বা সরবরাহ লাইনে বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর

পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে চাল, ডাল, সবজির দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। কৃষকের সেচ পাম্প থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার জেনারেটর-সবখানে ডিজেল ফার্নেস অয়েলের বাড়তি দাম পণ্য সেবার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই মূল্যস্ফীতির চাপেই মূলত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছেবৈশ্বিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের জন্য সংকট কাটানো কেবল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। বাংলাদেশের জন্য এই মেঘ কাটার সম্ভাবনা কয়েকটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: . বিকল্প জ্বালানির বৈচিত্র্যকরণ-বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সমাধান হলো জ্বালানির একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানো। সরকার বর্তমানে নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে কাজ করছে। যদি ২০৩০ সাল নাগাদ মোট বিদ্যুতের একটি বড় অংশ সৌর বা বায়ু শক্তি থেকে নিশ্চিত করা যায়, তবে তেলের ওপর চাপ অনেক কমে আসবে। এছাড়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পুরোদমে উৎপাদন শুরু হওয়া দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি মাইলফলক হতে পারে. নিজস্ব খনিজ অনুসন্ধান উত্তোলনে গতি-দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্থলভাগ সমুদ্রসীমায় গ্যাস তেল অনুসন্ধানে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে অফশোর ড্রিলিং বা গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা যদি দ্রুত কার্যকর হয়, তবে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত হবে। নিজস্ব গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উত্তোলন বাড়ানো সম্ভব হলে তেলের বিকল্প হিসেবে সিএনজি এলপিজির ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে. আধুনিক শোধনাগার স্টোরেজ সক্ষমতা-বাংলাদেশের ইস্টার্ন রিফাইনারি অনেক পুরনো, যার সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় সীমিত। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত শেষ করতে পারলে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশেই শোধন করা সম্ভব হবে, যা ফিনিশড অয়েল আমদানির তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। পাশাপাশি তেলের মজুত সক্ষমতা বা স্টোরেজ বাড়াতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কম থাকে, তখন বেশি করে তেল কিনে রাখা সম্ভব হবে. জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতি প্রযুক্তির ব্যবহার-ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বৈদ্যুতিক যানের (EV) বিপ্লব বাংলাদেশের জ্বালানি সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। মেট্রো রেলের মতো বৈদ্যুতিক গণপরিবহন ব্যবস্থা ঢাকার রাস্তায় তেলের চাহিদা কমাতে ইতিমধ্যে ভূমিকা রাখছে। এর ব্যাপ্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে তেলের আমদানি নির্ভরতা স্থায়ীভাবে কমবে

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও আশার আলো-বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও ডলারের সংকটের কারণে অনেক সময় তেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটে। এজন্য কারেন্সি সোয়াপ বা স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের মতো বিকল্প পথগুলো নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। তবে আশার কথা হলো, বিশ্বব্যাপী তেলের উচ্চমূল্যই এখন জ্বালানি দক্ষতার (Energy Efficiency) নতুন নতুন দ্বার খুলে দিচ্ছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সাশ্রয়ী নীতির দিকে হাঁটছে। কৃষিতে সোলার পাম্পের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শিল্পে আধুনিক বয়লারের ব্যবহার জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে ২০২৬ সালের পর থেকে জ্বালানি খাতের এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি কিছুটা হালকা হতে শুরু করবে বলে আশা করা যায়।

জ্বালানি সংকটের মেঘ তখনই কাটবে যখন বাংলাদেশ 'ইমপোর্ট লজিক' থেকে বেরিয়ে 'সেলফ রিলায়েন্স' বা স্বনির্ভরতার পথে হাঁটবে। আন্তর্জাতিক বাজার আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ব্যবস্থাপনা, বিকল্প শক্তির উন্নয়ন এবং নিজস্ব খনি অনুসন্ধান সম্পূর্ণ আমাদের হাতে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল এই সংকটের মেঘ কেটে বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি শহুরে শিল্পে আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসবে

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024