সাতক্ষীরা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (টিও) আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অভিযোগ, সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে তিনি ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ আত্মসাৎ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার জন্য প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২০ টাকা করে ফি আদায় করা হয়। অথচ প্রশ্নপত্র মুদ্রণের প্রকৃত খরচ সর্বোচ্চ ৬ টাকা। উপজেলায় প্রায় ৩১ হাজার শিক্ষার্থী থাকায় একেকটি মূল্যায়নে আদায় করা হয় প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। বছরে তিনটি মূল্যায়নে মোট আদায় দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা, যেখানে প্রকৃত ব্যয় প্রায় ৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। ফলে অতিরিক্ত প্রায় ১৩ লাখ টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষিকা অভিযোগ করেন, শিক্ষা কর্মকর্তা তাদের অফিসে ডেকে ব্যক্তিগত কক্ষে বসিয়ে রাখেন এবং আপত্তিকর কথাবার্তা বলেন। এমনকি কয়েকজনকে অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হলে তারা বিস্তারিত তথ্য দিতে প্রস্তুত বলে জানান।

এছাড়া বিভিন্ন বরাদ্দ বাবদও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ‘স্লিপ’ ও অন্যান্য খাতে স্কুল প্রতি ৫০০ টাকা এবং ক্ষুদ্র মেরামতের জন্য ১,৫০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পায়রাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক দপ্তরী কাম প্রহরীর চাকরি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সংক্রান্ত জটিলতায় পড়া দুই ব্যক্তির চাকরির কোটা পরিবর্তনের জন্য মোটা অংকের উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

এদিকে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সদর উপজেলার ৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংস্কারের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৬৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের দরজা-জানালা মেরামত, রং, বৈদ্যুতিক সংযোগ ঠিক করা, টয়লেট সংস্কার, পানির ব্যবস্থা ও অন্যান্য উন্নয়ন কাজ করার কথা ছিল।

কিন্তু সরেজমিনে কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, বাটকেখালি, দক্ষিণ ঘোষপাড়া, ধুলিহর ও কামাননগরসহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার কাজ হয়নি। অনেক স্থানে পুরনো অবকাঠামো আগের মতোই রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে সাংবাদিকদের তথ্য না দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এমনকি বরাদ্দের অর্থ থেকে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা অফিস খরচ হিসেবে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং পরে অফিস সহকারীর মাধ্যমে প্রায় ৮ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাদ্দের বড় একটি অংশ যথাযথ কাজে ব্যয় হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।

অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, কোনো অবস্থাতেই তথ্য গোপন করা যাবে না। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মিস আফরোজা আক্তার বলেন, দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ঘটনায় অভিভাবক ও সচেতন মহল দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024