|
Date: 2026-03-31 16:04:39 |
সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে শ্যামনগর উপজেলার রমজাননগর ও আশপাশের জনপদে এক ভয়ংকর অপরাধী চক্রের উত্থান ঘটেছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘ব্ল্যাক সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। সুন্দরবনের গহিন অরণ্য, ভারত সীমান্ত এবং কালিন্দী-খোলপেটুয়াসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর মোহনা ঘিরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট ইতোমধ্যেই পুরো এলাকাকে একপ্রকার জিম্মি করে ফেলেছে।
প্রাকৃতিকভাবে দুর্গম এই অঞ্চলকে কাজে লাগিয়ে চক্রটি জলদস্যুতা, আন্তঃদেশীয় অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেট এখন শুধু একটি অপরাধী চক্র নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে জামির আলী জামু, আব্দুল্লাহ তরফদার এবং আরএস খান, যিনি ‘ব্ল্যাক ডগ’ নামে কুখ্যাত। তাদের কর্মকাণ্ড শুধু দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
গোলাখালী গ্রামের বাসিন্দা জামির আলী জামু এই সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে একাধিক অস্ত্র, মাদক ও চোরাচালান মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবনের জলদস্যুদের কাছে ভারী অস্ত্র সরবরাহের অন্যতম প্রধান কারিগর সে। সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তার কার্যক্রম আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন এবং তাদের জমি দখলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে, যার ফলে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।
অন্যদিকে, কালইঞ্চি গ্রামের আব্দুল্লাহ তরফদার বর্তমানে ভারতে অবস্থান করেও পুরো চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নারী পাচার, ধর্ষণ, মাদক ও অস্ত্র মামলাসহ তার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অভিযোগ। ভারতীয় অপরাধী চক্রের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রেখে সে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে অবৈধ অস্ত্র ও মাদকের চালান পাঠাচ্ছে।
এই সিন্ডিকেটের আরেক শীর্ষ সদস্য আরএস খান, যিনি ‘ব্ল্যাক ডগ’ নামে পরিচিত, বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তি। স্থানীয়দের দাবি, তিনি মাদক ব্যবসার পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করছেন এবং তাদের সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি সাংবাদিকদেরও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে।
এই চক্রের আন্তর্জাতিক যোগাযোগও রয়েছে। ভারতের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ক্যানিং এলাকার বাসিন্দা যোগেশ নামে এক ব্যক্তি এই সিন্ডিকেটের ভারতীয় সংযোগ হিসেবে কাজ করছে। তার মাধ্যমে ভারত থেকে নিষিদ্ধ ওষুধ ও মাদক বাংলাদেশে পাচার করা হয়। একাধিকবার গ্রেফতার হলেও তার নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্র বহন করে এবং সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পায় না। ফলে মৎস্যজীবী ও বনজীবীদের জীবন-জীবিকাও চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
যদিও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে, তবে দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ এবং প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের জোর দাবি—দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই ‘ব্ল্যাক সিন্ডিকেট’ নির্মূল করা না হলে পুরো উপকূলীয় অঞ্চল অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হতে পারে।
© Deshchitro 2024