|
Date: 2026-04-12 22:04:28 |
◼️ অমিত হাসান : ছোটবেলা থেকেই ঘুরেবেড়ানোর ইচ্ছে আমার। যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি কাকি আম্মা বলেছিলেন যদি বৃত্তি পাই তবে দেশের সবগুলো বিভাগে ঘুরতে নিয়ে যাবেন। বৃত্তি পেয়েছিলাম। আল্লাহর অশেষ কৃপায় প্রাথমিকে সেবার ট্যালেন্টপুলেই বৃত্তি পাই আমি। কিন্তু জার্নিতে বমি করার বদ অভ্যাসটার কারণে গাজীপুর থেকে নরসিংদীও যাওয়া হয় নি আমার। একই কারণ স্কুল থেকে কোনো শিক্ষা সফরে বাইরের জেলায়ও যেতে পারি নি আমি। এনটিআরসিএ ১৮ তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করে শিক্ষকতায় আসার পর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথেই এবার আমার প্রথম শিক্ষা সফর। শিক্ষা সফরের জন্য গন্তব্য নির্ধারিত হয় সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ। মৌলভীবাজারের কথা শুনলেই অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর চা বাগানের কথা মনে ভাসে। আরেকটা কারণে মৌলভীবাজার বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান ছিলেন সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তিনি অসীম সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে এই মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ থানার ধলইয়ে শহীদ হয়েছিলেন।
৯ এপ্রিল ২০২৬। ফজরের নামাজ পড়েই খুব ভোরে রওনা হই প্রতিষ্ঠানের দিকে। আকাশ মেঘলা। যেন যেকোনো সময়ই ভারি বর্ষন হবে। চৈত্রের শেষদিকে কালবৈশাখীর ঝড় অবশ্য আমাদের অপরিচিত না। তবুও চাচ্ছিলাম বৃষ্টি যেন শিক্ষার্থীদের এই প্রথম সফরটায়ই বাগড়া না দেয়। আল্লাহ কবুল করলেন। বৃষ্টি থামলো। অবশ্য কোনো কোনো টিচার এবং কিছু শিক্ষার্থী বৃষ্টিতে হালকা ভিজেছিল। তাছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আমাদের নির্ধারিত বাসও আসতে একটু লেট করে ফেলেছিল । তবে সেসব অবশ্য আমাদের শিক্ষার্থীদের উৎসাহ, উদ্দীপনায় বিন্দুমাত্র ভাটা ফেলতে পারে নি। সকাল সকাল নাস্তা করেই আমরা রওনা হলাম মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উদ্দেশ্য করে। আমি বাসের সামনের দিকটায় বসলাম। প্রথম সারিতে শফিকুল স্যার আর সাত্তার স্যার। তাদের ঠিক পেছনটাতে সাইদুর স্যার আর আমি। আব্বাস স্যারকে অবশ্য ছাত্ররা পেছন দিকেই নিয়ে গেলেন। ম্যানেজিং কমিটির মোতালেব ভাই আর আজিমউদ্দিন হুজুরও আমাদের বাসেই ছিল। বাকি শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা ছিল অন্য বাসে। সফরের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ। বাস চলতে শুরু করলো। বাসেই শফিক স্যারের থেকে একটা লটারি নিলাম। যদি থাকে নসিবে এরকম ভেবে আর কী। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে বাস পৌঁছে গেল বড় সড়কে। তারপর এক সড়ক থেকে আরেক সড়ক, এক জেলা থেকে আরেক জেলা করে আমরা পৌঁছে গেলাম মৌলভীবাজার জেলায়। তারপর শ্রীমঙ্গলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই দুপাশের দিগন্তজোড়া চা বাগান দেখে মনে হলো, প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সবুজ মখমলের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে আমাদের অভ্যর্থনা জানাতে। শিক্ষার্থীরা যখন একেকটি পাহাড়ের বাঁকে চায়ের কুঁড়ি চয়নরত নারী শ্রমিকদের দেখছিল, তাদের চোখেমুখে তখন রাজ্যের বিস্ময়।
শিক্ষক হিসেবে আমার প্রাপ্তি ছিল এখানেই- বইয়ের পাতায় পড়া 'চা শিল্প' আজ তাদের চোখের সামনে জীবন্ত। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ই ঘুরে দেখার সুযোগ হলো। সব জায়গার নামও আমি জানি না। সত্যি বলতে শিক্ষার্থীদের চেয়ে শিক্ষা সফর নিয়ে কৌতূহল আমার কোনো অংশেই কম ছিল না। সেদিন শ্রীমঙ্গলের নামকরা একটা রেস্টুরেন্টে আমরা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা মিলে দুপুরের খাওয়া দাওয়া করলাম। তারপর আবার বাসে চড়ে একটা চা বাগানে গেলাম। জায়গাটার নাম মনে করতে পারছি না। সেখানে এক নারী শ্রমিকের সাথে কথা হয়। তিনি তাঁর দুঃখী জীবনের গল্প বলতে লাগলেন। আমি শুনলাম। পত্রিকায় চাকরি করার সময় কিছু কিছু শুনেছিলাম চা শ্রমিকদের কষ্ট নিয়ে। বাস্তবে শোনার সুযোগ হলো। মহিলাকে কিছু অর্থ সহযোগিতা করার চেষ্টা করলাম। তারপর সেখান থেকে যখন ফিরে আসি আমার ছাত্রীদের সাথে কথা হলো।
তারাও নাকি বিভিন্ন চা শ্রমিকদের সাথে কথা বলেছে। গল্প করেছে। তাদের জীবনের করুণ কাহিনি শুনেছে। আমার দু একজন ছাত্রীকে নাকি চা শ্রমিকরা কিছু উপহারও দিয়েছে। আমার অবশ্য তাদের থেকে উপহার পাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি। তবে আমার স্টুডেন্টরাই আমাকে ফুল দিয়েছে। তবে ফুলগুলো ওরা কোথায় পেয়েছে সেটা ভাববার বিষয়। বিকেলবেলা ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আজিজ ভাইয়ের উদ্যোগে লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়। আমি সেখানে একটা কলম পেলাম। যাইহোক সবমিলিয়ে সুন্দর সব চা বাগান দেখে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আজিজ ভাই এবং আমাদের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সাত্তার স্যারসহ পুরো আয়োজনের নেপথ্যে কাজ করা সকল শিক্ষক আর ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের একটা ধন্যবাদ দেওয়া বোধ হয় উচিতই ছিল। কিন্তু এখনো বলা হয় নি আর কী।
© Deshchitro 2024