|
Date: 2026-04-25 16:57:30 |
◼️ মো. রাশেদ মিয়া : স্মৃতির পাতায় ধুলো জমলে আজও ভেসে ওঠে সেই মায়াবী রূপালি রাত। গ্রামের দাওয়ায় গোল হয়ে বসে দাদু-নানিদের কিচ্ছা শোনা, আর একপাশে মিটিমিটি জ্বলা সেই পিতলের কুপি কিংবা টিনের হারিকেন। চিমনি মুছে পরিষ্কার করা, কেরোসিন তেলের সেই চেনা গন্ধ আর কাঁচের ভেতরে দুলতে থাকা শিখা—এসবই ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে হারিকেনের সেই শিখা নিভেছে, ঘরে ঘরে পৌঁছেছে বৈদ্যুতিক আলো। আক্ষেপের বিষয় হলো, বিজ্ঞানের এই আশ আশীর্বাদ আজ 'লোডশেডিং' নামক অভিশাপে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম বাংলা যেন আবার সেই অন্ধকার যুগে ফিরে যাচ্ছে, তবে এবার আর সেই মায়াবী পরিবেশ নেই, আছে কেবল দুঃসহ যন্ত্রণা।
এক সময় অন্ধকার ছিল গ্রামের স্বাভাবিক রূপ। মানুষ জানত সূর্য ডুবলে কুপির আলোয় রাতের কাজ সারতে হবে। সেই অন্ধকারে একটা ছন্দ ছিল, ছিল প্রশান্তি। কিন্তু আজকের অন্ধকার কৃত্রিম এবং অনাকাঙ্ক্ষিত। যখন যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত মানুষ হঠাৎ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে, তখন থমকে যায় সবকিছু। ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হয়, চার্জার ফ্যানের ব্যাটারি ফুরিয়ে আসে, আর ডিজিটাল ডিভাইসগুলো নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। পূর্বপুরুষদের সেই কুপির আলোয় যে পড়াশোনা হতো, আজকের তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে সেই মনোনিবেশ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে গ্রামীণ অর্থনীতি কেবল কৃষিতে সীমাবদ্ধ নয়; পোল্ট্রি খামার, ডেইরি শিল্প এবং উঠান-ভিত্তিক ক্ষুদ্র কলকারখানাই এখন গ্রামের প্রাণ। কিন্তু তীব্র তাপদাহ আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে খামারের মুরগি মারা যাচ্ছে, গরুর দুধ নষ্ট হচ্ছে। একদিকে দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং।
মাঠের বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। বগুড়ার সারিয়াকান্দির মতো গ্রামীণ জনপদগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা যেখানে ১০ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগও মিলছে না। ফলে সারাদিনে গড়ে ১০ থেকে ১২ বার লোডশেডিং সইতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। বোরো মৌসুমে যখন ধানে থোড় আসতে শুরু করেছে, তখন জমিতে নিরবচ্ছিন্ন পানি ধরে রাখা জীবন-মরণ প্রশ্ন। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে একজন সেচ পাম্প মালিককে দিনে ৮ থেকে ১০ বার মোটর চালু করতে হচ্ছে, যা কেবল সময়ক্ষেপণ নয়, বরং মূল্যবান বৈদ্যুতিক মোটর পুড়িয়ে ফেলার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে মানুষ যখন বিকল্প হিসেবে ডিজেলের দিকে ঝুঁকছে, তখন পাম্পগুলোতে ভিড় আর যানজট গ্রামীণ জীবনকে আরও অতিষ্ঠ করে তুলছে।
প্রাচীনকালে কৃষিকাজ ছিল বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আধুনিক যুগে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎই ফসলের প্রাণ। বর্তমানে সেচ পাম্পগুলো বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ থাকায় মাঠের ফসল রোদে পুড়ছে। বিদ্যুতের অভাবে কৃষক যখন চড়া দামে ডিজেল কিনে পাম্প চালায়, তখন তার লাভের গুড় পিঁপড়াময় হয়ে যায়। বর্তমানে দেশের অনেক জায়গায় বোরো মৌসুম বা রবি শস্যের সেচ চলছে। সন্ধ্যার পর যখন গৃহস্থালিতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখন সেচ পাম্পের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। এতে কৃষকের কাজের শিডিউল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে ডিজেল চালিত পাম্প ব্যবহারের ফলে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়াও গ্রামের ধান ভাঙানো কল, করাত কল কিংবা ছোট কারখানাগুলো এখন বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলায় মৃতপ্রায়। এক সময়কার হস্তশিল্পের জায়গা দখল করা বৈদ্যুতিক মেশিনগুলো এখন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
আমরা যখন স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন গ্রামীণ জনপদে ইন্টারনেটের গতি লোডশেডিংয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে কমে যায়। একজন ফ্রিল্যান্সার বা অনলাইন শিক্ষার্থী যখন ক্লাসের মাঝপথে বিদ্যুৎ হারায়, তখন তার ক্ষতি কেবল সাময়িক নয়, বরং তা দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ারের সংকট তৈরি করে। শহরের শিক্ষার্থীরা আইপিএসের সুবিধা পেলেও প্রান্তিক গ্রামের কিশোরটি আজও সেই মোমবাতির অস্পষ্ট আলোয় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা শিক্ষা বৈষম্যকে আরও প্রকট করছে। লোডশেডিংয়ের সময় মোবাইল টাওয়ারের ব্যাটারি ব্যাকআপ বেশিক্ষণ থাকে না। ফলে বিদ্যুৎ গেলে শুধু আলোই যায় না, ইন্টারনেট নেটওয়ার্কও ‘ডেড’ হয়ে যায়। যা একজন ফ্রিল্যান্সারের জন্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার নামান্তর। গ্রামীণ তরুণরা এখন ঘরে বসে ডলার আয় করছে, যা দেশের রেমিট্যান্সে বড় ভূমিকা রাখছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকা মানে এই রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধা দেওয়া।
তীব্র দাবদাহের মধ্যে যখন বিদ্যুৎ যায়, তখন গ্রামের টিনের ঘরগুলো যেন এক একটি আগুনের চুল্লিতে পরিণত হয়। সরকারি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সাধারণত আইপিএস বা জেনারেটরের শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকে না। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে সেখানে সংরক্ষিত বিশেষ করে শিশুদের টিকা (যেমন- পোলিও বা হামের টিকা) কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকি থাকে। ঘনঘন লোডশেডিং এবং ঘুমের ব্যাঘাত মানুষের কর্মক্ষমতা এবং মেজাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়। তীব্র গরমে এবং লোডশেডিংয়ে বাতাস চলাচলের অভাবে হাজার হাজার মুরগি মারা যাচ্ছে। একই অবস্থা ডেইরি খামারেও; গরুর দুধ উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং দুগ্ধজাত পণ্য সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে। অথচ বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে গ্রামের গ্রাহকরা শহরের চেয়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। তবে কেন এই সেবার বৈষম্য?
গ্রামীণ অর্থনীতির এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে কেবল আশ্বাসে কাজ হবে না; প্রয়োজন পরিকল্পিত ও বৈষম্যহীন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা। আমরা যখন ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ও ‘উন্নত রাষ্ট্র’ গঠনের কথা বলছি, তখন দেশের একটি বড় অংশকে অন্ধকারে রেখে সেই লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের কাছে আমাদের দাবিগুলো হওয়া উচিত সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী। কৃষি প্রধান এলাকাগুলোতে সেচের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে আলাদা ফিডার লাইন স্থাপন করতে হবে। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেচ পাম্প চালু রাখতে রেশনিং প্রথা থেকে কৃষিকে মুক্ত রাখা জরুরি। শহর এবং গ্রামের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে হবে। যদি লোডশেডিং করতেই হয়, তবে যদি লোডশেডিং করতেই হয়, তবে তার মাত্রা যেন ঢাকা বা বড় শহরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। গ্রামীণ গ্রাহকরাও সমান হারে ট্যারিফ প্রদান করেন, তাই সেবার ক্ষেত্রে এই বিমাতাসুলভ আচরণ বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। পোল্ট্রি এবং ডেইরি খামার যেখানে জীবন্ত প্রাণীর অস্তিত্ব জড়িত, সেখানে লোডশেডিংয়ের আগাম সতর্কবার্তা এবং বিশেষ জোনিং ব্যবস্থা চালু করা দরকার। গ্রামীণ তরুণ যারা আইটি বা ফ্রিল্যান্সিং পেশায় জড়িত, তাদের জন্য সুলভ মূল্যে বা কিস্তিতে মানসম্মত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা আইপিএস-এর বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রায়ই দেখা যায় সামান্য বৃষ্টি বা বাতাসে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকে। গ্রামীণ গ্রিড লাইনগুলোর আধুনিকায়ন এবং সংস্কার কাজের দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করতে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসগুলোকে আরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, প্রাচীনকালের সেই হারিকেন আজ ড্রয়িংরুমের শোপিস কিংবা জাদুঘরের বস্তু। আমরা আর সেই ধীরগতির জীবনে ফিরে যেতে পারব না, আর ফেরা সম্ভবও নয়। কিন্তু আধুনিকতার নামে গ্রামীণ মানুষকে অন্ধকারের খাঁচায় বন্দি করে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়। উন্নয়ন কেবল মেগাসিটি কেন্দ্রিক হলে চলবে না, বিদ্যুতের আলো পৌঁছাতে হবে মাঠের শেষ প্রান্তের কৃষকের ঘরেও। লোডশেডিংয়ের এই অপসংস্কৃতি বন্ধ না হলে গ্রামীণ অর্থনীতি ধসে পড়বে। আমরা চাই না হারিকেন আবার ফিরে আসুক প্রয়োজনের তাগিদে, আমরা চাই বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত সমৃদ্ধ এক গ্রামীণ বাংলাদেশ।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
© Deshchitro 2024