গোয়ালন্দে সিলেবাসে পৃষ্ঠাসংখ্যার ফাঁদ, নির্দিষ্ট বই কিনতে বাধ্য শিক্ষার্থীরা রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায় কিছু শিক্ষকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় নির্দিষ্ট প্রকাশনীর গাইড ও ইংরেজি গ্রামার বইয়ের রমরমা বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির বই কিনতে নানা কৌশলে বাধ্য করা হচ্ছে, যা শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অভিভাবক মহলে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সরকারি দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর গাইড ও গ্রামার বই ব্যবহারে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকেরা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ বা সুবিধা নিয়ে এসব বই বিক্রিতে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেছেন, প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তারা বিদ্যালয়ের কিছু সরঞ্জাম ক্রয় করে থাকেন। গোয়ালন্দ নাজির উদ্দিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, গোয়ালন্দ শহীদ স্মৃতি সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, গোয়ালন্দ প্রপার হাইস্কুলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক সিলেবাসে বিষয়ভিত্তিক অধ্যায়ের নামের পরিবর্তে সংখ্যা (যেমন: ৩, ৫, ৭, ৯) উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব সংখ্যা মূলত নির্দিষ্ট একটি গ্রামার বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা নির্দেশ করে, যা কিনতে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে। একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, নির্দিষ্ট গাইড বই থেকে উত্তর না লিখলে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও মডেল প্রশ্নও ওই গাইড থেকেই আসায় তারা বাধ্য হয়ে ওই বই কিনছে। অনেক শিক্ষক তাদের প্রাইভেট কোচিংয়েও একই গাইড অনুসরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিভাবকদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষা এখন অনেকাংশেই বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। অন্যান্য প্রকাশনীর বইয়ে ৪০-৫০ শতাংশ ছাড় থাকলেও নির্দিষ্ট গাইড বই মাত্র ১০ শতাংশ ছাড়ে কিনতে হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এই অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ শিক্ষকদের কাছে পৌঁছায়। আরও অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠানে সিলেবাস প্রণয়নের ক্ষেত্রেও অনিয়ম হচ্ছে। পূর্বে সিলেবাসে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর নাম থাকলেও বর্তমানে তা বাদ দিয়ে পৃষ্ঠাসংখ্যা নির্ভর সিলেবাস দেওয়া হচ্ছে, যা নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই বিক্রির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, লেকচার পাবলিকেশনের একজন বিক্রয় প্রতিনিধি লিটন জানান, শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি সাধারণত এজেন্ট ও কোম্পানি পর্যায়েই হয়ে থাকে। তিনি বলেন, “আমি মূলত স্কুলে বই সরবরাহ করি। আমাদের কোম্পানির বইয়ের চাহিদা বেশি থাকায় এগুলো বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।” উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার দাস বলেন, “বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। নির্দিষ্ট কোম্পানির গাইড-গ্রামার ব্যবহারে চাপ সৃষ্টি করা হলে তা অবশ্যই অনৈতিক। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।” অন্যদিকে, গোয়ালন্দ প্রপার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মোঃ হাবিবুর রহমান দাবি করেন, “আমরা কাউকে কোনো নির্দিষ্ট গাইড বা গ্রামার কিনতে বাধ্য করি না। শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দমতো বই কিনতে পারে।” তবে তার প্রতিষ্ঠানের সিলেবাসেও পৃষ্ঠাসংখ্যা উল্লেখ থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। সরকারি গোয়ালন্দ কামরুল ইসলাম কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ নজির হোসেন মোল্লা বলেন, “আমি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত পাঠ্যবই নিশ্চিত করতে কাজ করছি। আগের কোনো অনিয়ম থাকলে তা সংশোধনের চেষ্টা করা হবে।” উল্লেখ্য, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রাথমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে (প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত) গাইড ও নোটবই প্রকাশ, বিক্রয় ও ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও সেই আইন উপেক্ষা করে বিভিন্ন প্রকাশনীর গাইড বই প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবকেই নির্দেশ করে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু বিকাশের স্বার্থে এই অনিয়ম বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা।
প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024