|
Date: 2026-05-05 16:43:45 |
৫
আবু তালেব,লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি :
৫ মে নাটোরের লালপুরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস লিমিটেডের (নবেসুমি) এক রক্তাক্ত ও বেদনাবিধুর দিনের নাম। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অর্ধশতাধিক মানুষকে মিল প্রাঙ্গণের একটি পুকুরের সিঁড়িতে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। রক্তে লাল হয়ে ওঠা সেই পুকুরটি স্বাধীনতার পর ‘শহীদ সাগর’ নামে পরিচিতি পায়।
মঙ্গলবার (৫ মে) শহীদ সাগর গণহত্যা দিবস উপলক্ষে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস কর্তৃপক্ষ ফাতেহা পাঠ, পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল, খতমে কোরআন, কাঙালি ভোজ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা সহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করে।
মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন ভূঁইয়া টুটুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমীন পুতুল। তিনি বলেন, “নবেসুমির শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি মিলকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, মিলের আধুনিকায়ন, উপজাত পণ্য উৎপাদনের ব্যবস্থা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাজ হোসেন সৌরভ, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনার রশিদ পাপ্পু, সাবেক পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম মোলাম, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ও বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছিদ্দিক আলী মিষ্টুসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মুক্তিযোদ্ধা, সিবিএ নেতারা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেন।
বক্তারা বলেন, নবেসুমির শহীদ সাগর গণহত্যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস হত্যাযজ্ঞ হলেও এখনও তা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। তাঁরা দিনটিকে “নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস গণহত্যা দিবস” হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ লালপুর উপজেলার ময়না গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫ নম্বর রেজিমেন্ট বিপর্যস্ত হয় এবং মেজর আসলাম নিহত হন। এর প্রতিশোধ নিতেই ৫ মে পাকবাহিনী নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
সেদিন মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিএম অফিসের সামনে জড়ো করে প্রথমে গণনা করা হয়। পরে তাঁদের মিলসংলগ্ন পুকুরের সিঁড়িতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। মুহূর্তেই সেখানে লাশের স্তূপ জমে যায় এবং পুকুরের পানি রক্তে লাল হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পর সেই পুকুরটি ‘শহীদ সাগর’ নামে পরিচিতি পায়।
গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত অবস্থায় বেঁচে যাওয়া খন্দকার জালাল আহাম্মেদ মৃত্যুর আগে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে জানান, পাকবাহিনী প্রথমে আশ্বাস দিয়েছিল মিল চালু রাখলে কারও ক্ষতি করা হবে না। পরে সবাইকে পুকুরের সিঁড়িতে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। ওই হামলায় তাঁর ছোট ভাই আব্দুল মান্নান নিহত হন।
শহীদ সাগরের সিঁড়ির বিভিন্ন স্থানে এখনও গুলির চিহ্ন সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী আব্দুর রশিদ বলেন, “সিঁড়িতে পা রাখলেই মনে হয় ইতিহাসের ভয়াবহতা এখনও জীবন্ত হয়ে আছে।”
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৫ মে শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০০০ সালের ৫ মে উদ্বোধন করা হয় শহীদ স্মৃতি জাদুঘর। জাদুঘরের উদ্বোধনী পরিদর্শন বইয়ে শহীদ লেফটেন্যান্ট এম এ আজিমের স্ত্রী শামসুন্নাহার আজিম লিখেছিলেন, “স্বাধীনতার জন্য নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের যে অবদান, বুকচিরে এক পুকুর রক্তদানের স্বীকৃতি এই জাদুঘরের মাধ্যমে দেওয়া হলো।”
প্রতি বছর ৫ মে শহীদ পরিবারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শহীদ সাগর প্রাঙ্গণে এসে শ্রদ্ধা জানান। কেউ খুঁজে ফেরেন হারানো স্বজনের স্মৃতি, কেউ নীরবে অনুভব করেন স্বাধীনতার জন্য আত্মোৎসর্গের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস।
© Deshchitro 2024