সকাল গড়াতেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে বাড়তে থাকে রোগীর ভিড়। কেউ জ্বর নিয়ে আসছেন, কেউ দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস বা গ্যাস্ট্রিক সমস্যায়। হাসপাতালের করিডোর, বারান্দা আর চিকিৎসকদের কক্ষের সামনে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ের মাঝেই চোখে পড়ে আরও কিছু মুখ- হাতে ফাইল, কাঁধে ব্যাগ, পরনে ফরমাল পোশাক। তারা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রতিনিধি।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দালালবিরোধী অভিযানে ঔষধ কোম্পানির কয়েকজন প্রতিনিধিকে আটক করার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই পেশা। বিশেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ অভিযানে কয়েকজন প্রতিনিধিকে গ্রেফতার ও তাদের “দালাল” আখ্যা দেওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় পুরো ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিনিধিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেকে এটিকে “পেশাজীবীদের সামাজিক অপমান” বলেও মন্তব্য করেছেন।

এদিকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সংগঠন “ফারিয়া”র উদ্যোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের খবর পাওয়া গেছে। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিরা বলেন, তারা দালাল নন; বরং একটি করপোরেট ব্যবস্থার অধীনে কাজ করা পেশাজীবী।তবে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাস্তবতা এতটা সরল নয়।

শিবচরের চিত্রও অনেকটা একই রকম। এখানে সরকারি হাসপাতাল ঘিরে যেমন রোগী ধরার অভিযোগ আছে, তেমনি রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রতিনিধিদের নিয়ে নানা আলোচনা। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, সবকিছুকে এক পাল্লায় মাপলে বাস্তব সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ঔষধ কোম্পানির এক প্রতিনিধি বলেন, “আমাদের মূল কাজ ডাক্তারদের কাছে ওষুধের তথ্য দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে শুধু এই কাজ করলেই চলে না। কোন ডাক্তার কত প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন, সেটা অফিসে রিপোর্ট করতে হয়।”

তিনি বলেন, “অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। চাকরির টার্গেট পূরণ না হলে চাপ আসে। তখন বাইরে থেকে মানুষ যা দেখে, সেটাকেই দালালি মনে করে।”

কথা হয় আরেক প্রতিনিধির সঙ্গে। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে তিন বছর ধরে এই পেশায় আছেন। তিনি বলেন, “আমরা কেউ দালাল হতে আসিনি। পরিবার চালাতে চাকরি করছি। কিন্তু সিস্টেমটাই এমন, অনেক সময় সম্মান নিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে যায়। 

স্থানীয় কয়েকজন চিকিৎসক ও ফার্মেসি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিবচরেও বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে প্রেসক্রিপশন নিয়ে প্রতিযোগিতা রয়েছে। চিকিৎসকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন প্রতিনিধিরা।

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানেই তৈরি হয় নৈতিকতার প্রশ্ন। কারণ অনেক সময় অভিযোগ ওঠে—কিছু চিকিৎসক বিভিন্ন সুবিধা বা উপঢৌকনের বিনিময়ে নির্দিষ্ট কোম্পানির ঔষধ বেশি লিখছেন।

একজন স্থানীয় ঔষধ ব্যবসায়ী বলেন, “অনেক রোগী আসে বড় বড় প্রেসক্রিপশন নিয়ে। পাঁচ-ছয়টা ওষুধ না লিখলেও যেখানে চিকিৎসা চলত, সেখানে দশ-বারোটা ওষুধ লেখা থাকে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারের এই প্রবণতাকে বলা হয় “পলিফার্মেসি”। এতে রোগীর চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কিডনি ও লিভারের জটিলতার ঝুঁকিও বাড়ে।

সরকারি হাসপাতালে রোগীকে বিভিন্ন ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। সাধারণ মানুষ তাদের “দালাল” হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—স্বাস্থ্যখাতের পুরো সমস্যার দায় কি কেবল মাঠপর্যায়ের কিছু লোকের?

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, একজন ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিনিধি হয়তো কোম্পানির নির্দেশনা অনুসরণ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোন ওষুধ রোগীকে দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকই।

তাই শুধু প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন অনেকে। প্রয়োজন পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

শিবচরের সচেতন নাগরিকদের অনেকেই বলছেন, স্বাস্থ্যসেবায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে সবার জন্য সমান নীতিমালা প্রয়োজন। প্রেসক্রিপশন সংগ্রহের সংস্কৃতি বন্ধ করা, চিকিৎসক ও কোম্পানির আর্থিক সম্পর্ক স্বচ্ছ করা এবং রোগীদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধের চাপ থেকে মুক্ত রাখা জরুরি।

স্থানীয় এক শিক্ষক বলেন, “একজন প্রতিনিধি যদি চাকরির চাপে ভুল করেন, তাহলে তাকে দায় নিতে হবে। কিন্তু যে ডাক্তার বা প্রতিষ্ঠান এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখছে, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।”

স্বাস্থ্যখাতের এই অস্বস্তিকর বাস্তবতায় শিবচরের চিত্র হয়তো আলাদা নয়। তবে প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে—সমস্যা কি কেবল কিছু প্রতিনিধির, নাকি পুরো ব্যবস্থার?


প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024