|
Date: 2026-05-18 17:23:53 |
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন নদীভাঙন প্রতিরোধ ও উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষা প্রকল্পে বাধা, চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও নিরাপত্তা চেয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)।
অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে শ্যামনগর উপজেলার ৯ নম্বর বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ এবং সুরা সদস্য হাজী মো. নজরুল ইসলামকে। তার বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে হস্তক্ষেপ, কাজ বন্ধ করে দেওয়া, শ্রমিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদা দাবি এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত ১৩ মে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর পাঠানো লিখিত অভিযোগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ প্রকল্প (কম্পোনেন্ট-১)’ এর প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া জানান, শ্যামনগরের খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা এবং বাঁধ সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বর্তমানে হুমকির মুখে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, শ্যামনগরের বিভিন্ন নদীতীর রক্ষায় প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পোল্ডার-৫ এলাকায় স্লোপ প্রোটেকশন, জিওব্যাগ ডাম্পিং ও সিসি ব্লক স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডিএল-উন্নয়ন (জেভি), ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের পক্ষে আর-রাদ করপোরেশন। পূর্ব দুর্গাবাটি, পশ্চিম দুর্গাবাটি, দাতিনাখালী ও ঝাপালি এলাকায় কাজ চলছে।
অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্প শুরুর পর থেকেই চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বিভিন্নভাবে কাজ বন্ধের চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের হুমকি দেওয়া, শ্রমিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সরাসরি প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন এবং চাঁদা দাবি করেন। দাবি পূরণ না হলে প্রকল্প অফিস ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যন্ত্রপাতি নষ্ট ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয়। পরে সেনাবাহিনী ক্যাম্প, জেলা প্রশাসন ও শ্যামনগর থানায় একাধিকবার লিখিত অভিযোগ করা হলেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষার আগে বাঁধ সুরক্ষার কাজ সম্পন্ন না হলে জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকি নিয়েও সীমিত পরিসরে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ১৪ এপ্রিল পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকায় প্রকল্প সাইটে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, স্থানীয় কয়েকজন জামায়াত নেতাকর্মী ও বহিরাগতদের নিয়ে মানববন্ধনের নামে বিক্ষোভ করা হয়। এ সময় শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মারধরের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি স্কেভেটরের চালক ও সহকারীকে যন্ত্রের ভেতরে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও করা হয়েছে। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ঘটনার পর শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অধিকাংশ শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দেন বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান অভিযোগ করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্প পরিদর্শনে গেলে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তার কাছে ১২ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয়। টাকা না দিলে কাজ বন্ধ, মানববন্ধন ও অপপ্রচারের হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে গত ১৪ এপ্রিল শ্যামনগর থানায় দায়ের করা আরেকটি অভিযোগে প্রকল্পের আইন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন উল্লেখ করেন, সরকারি জমিতে সিসি ব্লক তৈরির কাজ চলাকালে চেয়ারম্যান লোকজন নিয়ে এসে কাজ বন্ধ করে দেন। পরদিন ৩০ থেকে ৪০ জন লোক নিয়ে নির্মাণাধীন বাঁধ ভেঙে ফেলার অভিযোগও করা হয়। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারি সামাজিক বনায়নের জমিতে অবৈধভাবে ব্লক নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছিল। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই তিনি বাধা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, জমি সংক্রান্ত পূর্বের বিরোধের জের ধরে তাকে হয়রানির চেষ্টা চলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক অভিযোগে উল্লেখ করেন, বর্ষা মৌসুমের আগেই কাজ শেষ করা না গেলে ভয়াবহ নদীভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে জনবসতি, কৃষিজমি ও উপকূলীয় প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে আন্তর্জাতিক পরিসরে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রকল্প এলাকায় প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত, কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম রাজু আহমেদ বলেন, নতুন পুলিশ সুপার যোগদান করেছেন। বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত হচ্ছি। সরকারি কাজ বাস্তবায়নে জেলা পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা জেনেছি। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হাতে পাইনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
© Deshchitro 2024