|
Date: 2026-05-22 12:52:51 |
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গড় অঞ্চলের অরণখোলা ইউনিয়নের পীরগাছা শাখা ডাকঘরটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। গুরুত্বপূর্ণ এই ডাকঘরটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এলাকার হাজার হাজার মানুষ ডাক যোগাযোগের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই অঞ্চলের মানুষ একটি সাধারণ চিঠিপত্র বা জরুরি সরকারি নথি আদান-প্রদানে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পীরগাছা বাজারের পাশে অবস্থিত ডাকঘরটি বর্তমানে পরিত্যক্ত। ঘরের দেয়ালে নোনা ধরে পলেস্তারা খসে পড়ছে, চারপাশ ছেয়ে গেছে লতাপাতায়। জানালার কপাট ভাঙা এবং ঘরের ভেতরে ধুলোবালির স্তুপ জমে আছে। ডাকঘরের সামনে ঝুলছে একটি নামফলক। সেখানে লেখা রয়েছে, পীরগাছা ডাকঘর, মধুপুর-১৯৯৬, টাঙ্গাইল। ডাকের বক্স ভাঙ্গচুড়া অবস্থায় দেওয়ালে ঝুলে আছে এবং নামফলকটিও দীর্ঘদিন অযতœ-অবহেলায় মরচে ধরে গেছে। দীর্ঘ দেড় দশক তালাবদ্ধ থাকায় ভবনটি এখন অকেজো ও ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কাবেরী মৃ ও প্রিন্স এডওয়াড মাংসাং সাথে কথা বলে জানা যায়, সেবা বঞ্চিত গারো সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষ। পীরগাছা ও এর আশপাশের অন্তত ১০-১২টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল এই ডাকঘর। এলাকার চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র, নিয়োগপত্র বা উপবৃত্তির তথ্যের জন্য এই ডাকঘরের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ জানান, ১৫ বছর আগে যখন পোস্টমাস্টার অবসরে যান, তারপর থেকে এখানে আর কেউ কাজে আসেনি। এখন আমাদের সাধারণ একটা চিঠির জন্য অনেক দূরে মধুপুর সদর বা অন্য এলাকায় যেতে হয়। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ চিঠি ঠিকানায় সময়মতো পৌঁছায় না।
ভুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, চাকরির ইন্টারভিউয়ের চিঠিপত্র অনেক সময় সঠিক সময়ে পাই না। এর আগেও পীরগাছা ডাকঘর ছিল বলে অনেক চিঠিপত্র সময় মতো পেতাম। এখন উপজেলা সদরের ডাকঘরে গিয়ে খবর নিতে হয়। এতে করে ভোগান্তির শেষ নেই। তিনি আরোও বলেন আগে ডাকঘরে পোস্টাল অর্ডার, মানি অর্ডারসহ বিভিন্ন সেবা সহজে পাওয়া যেত। এখন ডাকঘর বন্ধ থাকায় অনেক জরুরি কাজের চিঠিপত্র সময়মতো পাওয়া যায় না।
বিপাকে পড়ছে পেনশনভোগী ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়ীরা। ডাকঘরটি বন্ধ হওয়ার আগে এখানে অনেক সাধারণ মানুষ ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পের আওতায় টাকা জমা রাখতেন। এছাড়া এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা এখান থেকে তাদের পেনশনের টাকা তুলতেন। বর্তমানে পোস্ট অফিসটি বন্ধ থাকায় বয়স্ক মানুষদের ১০-১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হচ্ছে, যা তাদের জন্য শারীরিক ও আর্থিকভাবে কষ্টসাধ্য।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই দুরবস্থা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে বারবার জানানো হলেও কোনো সুফল মেলেনি। পীরগাছা অরণখোলা ইউনিয়ন পরিষদের কয়েকজন সদস্য জানান, ডাকঘরটি চালু হলে অত্র অঞ্চলের মানুষের সময় ও টাকা দুটোই বাঁচত।
পীরগাছা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বর খোকন বর্মন জানান, পীরগাছা ডাকঘরটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে হাজারো মানুষ ডাক বিভাগের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি কয়েকবার ডাক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য স্থানীয় ডাক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাসলিমা জানান, ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় স্থানীয় মধুপুর ডাকঘর অফিস থেকে রানার ম্যান দিয়ে কার্যক্রম চলছে। রানার ম্যান চিরমান্ত রিচিলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা মধুপুর থেকে চিঠিপত্রগুলো এনে সেবাপ্রদান করে থাকি। তিনি আরোও বলেন বসার মতো আমাদের কোনো স্থান নেই তবে যে অফিস ছিলো সেটি এখন ব্যবহার হয় না। পরীগাছা ডাকঘরে দায়িত্বরত পোস্টমাস্টার বিপ্লব রিচিল বলেন, বসার স্থান নেই বলে নিজেদের বাসায় বসে পোস্ট অফিসের কাজ সেরে নেই।
এসময় মধুপুর উপজেলার দায়িত্বরত পোস্টমাস্টার তাসলিমা বলেন, জনস্বার্থে এবং এলাকার গুরুত্ব বিবেচনা করে পুনরায় ডাকঘরটি চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান।
পীরগাছাবাসীর দাবি, ডিজিটাল বাংলাদেশে ডাক বিভাগের সেবার মানোন্নয়নে সরকারের নানামুখী উদ্যোগের প্রশংসা থাকলেও, পীরগাছা ডাকঘরটির জরাজীর্ণ অবস্থা সরকারের সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এলাকাবাসী দ্রæত ডাকঘরটি সংস্কার করে সেবা চালু করার দাবি জানিয়েছেন। ডাক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দ্রæত এই সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেবেন, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
© Deshchitro 2024