বন্যায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ভূমিধস হয়ে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যায়। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত দিয়াকুল গ্রামে ১১৬টি পরিবার নিয়ে গঠিত আশ্রয়ণ প্রকল্প। এতে ১৯৯৯ সাল থেকে মানুষ বসবাস করে আসছে। তিন দিকের পাহাড় কেটে মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে এই আবাসনস্থল। প্রতি বর্ষায় তিন দিকের পানি এক পাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় চলাচলের রাস্তার মাটি ধুয়ে নিচে নেমে যায়। এতে সৃষ্টি হয় বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ।


গত ২০ জুলাই রাতে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যান চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদ। ওই সময় ফোনে দোহাজারী পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. নাঈম উদ্দীনকে বলতে শোনা যায়—“দিয়াকুলের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেহাল দশা, এটাকে কী পৌরসভা বলে মানুষ!” প্রতিউত্তরে প্রকৌশলীর কাছে পৌরসভার ফান্ডের কথা জানতে চেয়ে এমপি নির্দেশ দেন, “আগামীকালই আপনি আসেন। এসে রাস্তা ও ড্রেন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ ধরার মতো দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়ায় নিয়ে যাবেন।” ওই সময় উৎসুক জনতা করতালি দিয়ে এমপিকে অভিবাদন জানান। প্রয়োজন হলে দুই-তিন দিন পর এসে সরেজমিনে পরিদর্শনেরও নির্দেশ দেন তিনি। 


তবে এ ঘটনার এক মাস অতিবাহিত হলেও তার দেওয়া প্রতিশ্রুতির কোনো বাস্তবায়ন দেখেনি এলাকাবাসী। ফলে এ-সংক্রান্ত ভিডিওটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।


দিয়াকুল যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, “পৌরসভার প্রকৌশলী এসে হাবিজাবি কথা বলছেন। ভরাট করার মাটি নাকি নেই, আশপাশে কোনো মাটি পাওয়া যাচ্ছে না—এসব অজুহাতে এখনো কাজ শুরু হয়নি। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মাটির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তারা কাজ করছে না। এমপি এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ করার নির্দেশ দিলেও ইতোমধ্যে এক মাস পার হয়ে গেছে। ঠিকাদার ইউসুফ স্কেভেটর পাঠিয়ে মাটি কেটে সমান করে দেওয়ার কথা ছিল। প্রকৌশলীর এমন চালবাজির কথা স্থানীয় বিএনপি নেতাকে জানানো হয়েছে। প্রকল্পের মানুষ এখন তাদের ভুয়া ও টাউট মনে করছে। কারণ, এমপির নির্দেশের তিন দিন পর এসে ফিতা দিয়ে রাস্তা মেপে এস্টিমেট নিয়ে গেলেও গত এক মাসে তাদের আর দেখা মেলেনি। তবে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর গত ২৫ আগস্ট তারা এসে পুনরায় কাজ শুরু করার কথা বলে গেছেন।”


এ বিষয়ে দোহাজারী পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. নাঈম উদ্দীন জানান, এমপি মহোদয় তাৎক্ষণিক আদেশ দিয়েছিলেন। তবে সরকারি বিধিবিধান ও নিয়মকানুন মেনেই কাজ করতে হয়। তিনি বলেন, “আমরা ঘটনার পরদিনই বালুর বাঁধ দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করেছি। সেখানে বেড়িবাঁধে ব্যবহৃত তিন-চার লেয়ারের জিও ব্যাগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঝখানে আবারও বন্যা হওয়ায় কিছু অংশ ধসে গেছে। এসব কারণে মূল কাজ শুরু হতে বিলম্ব হলেও এ সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।”


তিনি আরও বলেন, “একটি প্রজেক্ট দাঁড় করাতে সময় লাগে। ফিজিবিলিটি টেস্ট এবং ট্রান্সেটিভিটি চিন্তা না করে কাজ করলে তো পরে ধসে যাবে। পাহাড় ধসে মাটি সরে গেছে, আগে এটা ভরাট করতে হবে। তবে মাটি না পাওয়ার বিষয়টি সত্য। এলাকাবাসী পাহাড় থেকে মাটি কাটার কথা বলছে, যা বেআইনি হওয়ায় আমরা নিতে পারছি না। শীতকাল না এলে প্রয়োজনীয় মাটি পাওয়া কঠিন। আপাতত ড্রেসিং করে চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।”


পাহাড়ি বালু ধসে যাওয়া ঠেকাতে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রকৌশলী টিম দিয়ে কারিগরি ও ফিজিবিলিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হচ্ছে।


তিনি আরও বলেন, “এমপি মহোদয় যখন রাতে গেছেন, তখন এলাকাবাসী তাকে ঘিরে ধরেছিল। তিনি রাস্তার সার্বিক অবস্থা দেখে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তাৎক্ষণিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে এর প্রশাসনিক ও কারিগরি বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরই নিয়ম মেনে করতে হয়।”


তবে সরকারি প্রোকিউরমেন্ট বিধিমালা, আইনি প্রক্রিয়া এবং কারিগরি বিষয় বিবেচনা করে একটি স্থায়ী ও টেকসই কাজ নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024