টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা সদরের ব্যস্ত সড়কের পাশে ছোট শিশুটিকে বুকে চেপে ধরে নিঃশব্দে কাঁদছিলেন এক নারী। অচেনা মানুষজনের নানামুখী প্রশ্নে ভয়ে আর আতঙ্কে আরও গুটিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। দীর্ঘ তিন দিনের ক্লান্তি, অনাহার আর চরম অনিশ্চয়তায় মানসিক ভারসাম্য হারানোর উপক্রম হওয়া সেই অসহায় মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল সামাজিক সংগঠন প্রয়াস।

ভুক্তভোগী নারীর নাম লক্ষ্মী দাস। তিনি সুনামগঞ্জের শেরপুর এলাকার কাউরাত গ্রাম থেকে নিখোঁজ স্বামী স্বপন দাসের খোঁজে মধুপুরে এসেছিলেন। তিনি জানান, প্রায় ৬ লাখ টাকার ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে তাঁর স্বামী পাওনাদারদের ভয়ে মধুপুরে এসে আত্মগোপন করেন। স্বামীর দেওয়া তথ্যের ওপর ভরসা করেই তিনি সন্তানকে নিয়ে এখানে আসেন। কিন্তু মধুপুরে পা রাখার পর থেকেই স্বামীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পান।অচেনা শহরে শিশুসন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফেরার মতো কোনো অর্থ বা আশ্রয় না থাকায় টানা তিন দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে রাস্তায় রাস্তায় দিন কাটছিল তাঁদের। মধুপুর বাসস্ট্যান্ডে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তার মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা কিছু জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। ফলে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগের শেষ পথটুকুও বন্ধ হয়ে যায়। অশিক্ষিত হওয়ায় তিনি কারও মোবাইল নম্বরও বলতে পারছিলেন না।

বিষয়টি নজরে আসামাত্রই ‘প্রয়াস’ টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিড় সরিয়ে তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেন। প্রচণ্ড মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাওয়া লক্ষ্মী দাশকে সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করা হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে মা ও শিশুর জন্য পুষ্টিকর খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা হয়। ক্ষুধার্ত শিশুটিকে নিয়ে অবশেষে খাবার গ্রহণ করেন তিনি।

পরবর্তীতে প্রয়াস টিম বিষয়টি মধুপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাইফুল ইসলামকে জানালে তিনি দ্রুত মানবিক পদক্ষেপ নেন। প্রাথমিক খরচ বাবদ আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থানকালেই মুঠোফোনে নির্দেশ দেন মা-শিশুকে নিরাপদে সুনামগঞ্জে ফিরিয়ে দেওয়ার এবং সম্পূর্ণ যাতায়াত খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দেন।

প্রশাসনের নির্দেশনায় ‘প্রয়াস’ টিম কালবিলম্ব না করে তাঁদের বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে।এদিকে শিক্ষাবিদ ও প্রয়াসের উপদেষ্টা মোহাম্মদ নাজিবুল বাশার স্যারের বিশেষ সহযোগিতায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বাসের টিকিট নিশ্চিত করা হয় এবং দূরপাল্লার এই দীর্ঘ সফরের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও পানি সঙ্গে দিয়ে তাঁদের বাসে তুলে দেওয়া হয়।

পুরো মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা ও উপস্থিতিতে ছিলেন প্রয়াসের সাধারণ সম্পাদক সেলিম তালুকদার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক  (প্রশাসনিক) আনাস মোহাম্মদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (কার্যনির্বাহী) শাহরিয়ার রাফি এবং সংগঠনের সক্রিয় সদস্য মোসাদ্দেক হোসেন। বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোয় প্রয়াস টিম ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতি চোখের জলে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নিজ গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হন লক্ষ্মী দাস।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024