|
Date: 2026-09-03 15:11:34 |
সাতক্ষীরা শহরতলীর তালতলা এলাকায় বিসমিল্লাহ ফুডসের কর্মচারী কোহিনুর খাতুনকে (প্রায় ৪০ বছর) শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে বিসমিল্লাহ ফুডসের মালিক আব্দুস সোবহানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে নিহতের ভাই লাবসা ইউনিয়নের খেলারডাঙী গ্রামের ইমরান হোসেন বাদী হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলার নম্বর জিআর-৪১২/২৬ (সদর)। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে উপপরিদর্শক শাহাদাৎ হোসেনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিহত কোহিনুর খাতুনের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৭ বছর আগে পাটকেলঘাটার লালচন্দ্রপুর গ্রামের আবু মুছার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে তাদের একমাত্র সন্তান মোহাম্মদ মুন্না। পরবর্তীতে স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় সংসারে আর্থিক সংকট ও পারিবারিক অশান্তি দেখা দেয় বলে পরিবারের দাবি। একপর্যায়ে ২০২১ সালের প্রথম দিকে কোহিনুর তার সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি খেলারডাঙী গ্রামে চলে আসেন।
পরে ছেলে মুন্নাকে বল্লী ইউনিয়নের আমতলা ছিদ্দিকিয়া-বরকতিয়া হেফজোখানা ও এতিমখানায় ভর্তি করা হয়। চলতি বছর সে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে হাফেজ পাস করেছে বলে পরিবার জানিয়েছে।
বাবার বাড়িতে ফিরে কোহিনুর প্রথমে বিনেরপোতার ঢাকা ফুডস এবং পরে সাতক্ষীরার একটি বেকারিতে কাজ করেন। এরপর প্রায় আড়াই বছর ধরে মাসিক আট হাজার টাকা বেতনে তালতলার বিসমিল্লাহ ফুডস কারখানায় কর্মরত ছিলেন।
পরিবারের অভিযোগ, কারখানায় কাজ করার সময় মালিকের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগমের সঙ্গে কোহিনুরের বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। নিহতের ছেলে মোহাম্মদ মুন্নার দাবি, তার মায়ের সঙ্গে কারখানার মালিক আব্দুস সোবহানের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে মালিকের স্ত্রী মঞ্জুয়ারার সঙ্গে একাধিকবার বিরোধ ও মারামারির ঘটনা ঘটে।
মুন্না জানান, সোমবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে তার মা কারখানার উদ্দেশ্যে নানা বাড়ি থেকে বের হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় কারখানার মধ্যে এবং ফটকের সামনে মঞ্জুয়ারা বেগম তার মাকে মারধর করেন। পরে কোহিনুর সেখান থেকে চলে আসতে চাইলে তাকে আবার কারখানায় ডেকে নেওয়া হয়। এরপর রাতে তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সোমবার রাত ১১টার দিকে কোহিনুরের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তালতলা এলাকার আব্দুল খালেকের পানিবন্ধি জমি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতের ছেলে আরও জানান, কয়েকদিন আগে তার মাকে অজ্ঞাত কয়েকজন ফোনে বিরক্ত করায় তিনি সিম পরিবর্তন করেছিলেন। কোহিনুরের সঙ্গে আব্দুস সোবহানের কথিত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে মালিকের স্ত্রী মঞ্জুয়ারার সঙ্গে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আব্দুস সোবহান পুলিশের কাছে নিজের বক্তব্যে কোহিনুরের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করলেও হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, কোহিনুর ও তার ছেলে মুন্নার পড়াশোনায় তিনি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন। মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, বিসমিল্লাহ ফুডসের সাতজন শ্রমিক পার্শ্ববর্তী আমজাদ হোসেনের স’মিলের ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করতেন। তাদের দাবি, কোহিনুরের সঙ্গে কারখানার মালিকের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে তার স্ত্রী মঞ্জুয়ারা বেগমের সঙ্গে কয়েক দফা বিরোধ হয়েছিল।
কারখানার মিস্ত্রী আরিফুল ইসলাম জানান, সোমবার তিনি ব্যক্তিগত কাজে নিজ বাড়ি কালিগঞ্জের চম্পাফুলে ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে কারখানায় ফিরে কোহিনুরের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। পরে তিনি অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে কোহিনুরের বাড়িতে যান।
স্থানীয় কয়েকজনের ধারণা, সোমবার রাত ৮টার পর কারখানা থেকে বের হওয়ার সময় কোহিনুরকে হত্যার পর তার মরদেহ অন্যত্র নিয়ে গিয়ে পানিবন্ধি জমিতে ফেলে রাখা হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি তাদের ধারণা; এর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে।
নিহতের স্বামী আবু মুছা জানান, পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোহিনুর ও ছেলে মুন্নার সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। সাংবাদিকদের মাধ্যমে তিনি স্ত্রীর মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছেন বলে জানান।
এদিকে কোহিনুরের মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরে রাতে খেলারডাঙা গ্রামের বাড়ির সামনে তাকে দাফন করা হয়।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহমুদুর রহমান জানান, কোহিনুরকে শ্বাসরোধ করে হত্যার ঘটনায় তার ভাই ইমরান হোসেন বাদী হয়ে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে বিসমিল্লাহ ফুডসের মালিক আব্দুস সোবহানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ওসি জানান, বুধবার তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন করা হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক শাহাদাৎ হোসেন ঘটনাটি তদন্ত করছেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে মঞ্জুয়ারা বেগমের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত—তা পুলিশি তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত হবে।
© Deshchitro 2024