১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল ও বিষাদময় দিন। যশোর জেলার শার্শার গোয়ালহাটি ও ছুটিপুরে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ। সহযোদ্ধার জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনকে বাজি রেখে লড়াইয়ের যে অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

জীবন বাজি রেখে সহযোদ্ধা রক্ষা ও শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই:

১৯৭১ সালের এই দিনে শার্শার বয়রা অঞ্চলে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ বেঁধে যায়। যুদ্ধে শত্রুপক্ষের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন নূর মোহাম্মদের সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া। এক মুহূর্তও দেরি না করে, এক হাতে এলএমজি ধরে অন্য হাতে আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন নূর মোহাম্মদ এবং শত্রুর দিকে একনাগাড়ে গুলি চালাতে থাকেন।

হঠাৎ পাকবাহিনীর একটি মর্টারের গোলা এসে তাঁর হাঁটুতে আঘাত হানে, ভেঙে যায় পা। রক্তে ভেসে যায় চারপাশ, তবুও পিছু হটেননি তিনি। অন্য সহযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে একাই শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান এবং এক পর্যায়ে শাহাদাতবরণ করেন। পরবর্তীতে যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে এই বীর সন্তানকে সমাহিত করা হয়।

সাধারণ জীবন থেকে বীরত্বের ইতিহাস:

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মোহাম্মদ আমানত শেখ ও মা জেন্নাতুন্নেছা (মতান্তরে জেন্নাতা খানম)-কে বাল্যকালেই হারিয়ে জীবনসংগ্রাম শুরু করতে হয় তাঁকে।

১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর, যা বর্তমানে বিজিবি) যোগ দেন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭০ সালে যশোর সেক্টরে বদলি হন এবং ল্যান্স নায়েক পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

শ্রদ্ধা ও স্মৃতির পাতায় নূর মোহাম্মদ:

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

এই বীরের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্মৃতিকে ধরে রাখতে ২০০৮ সালে তাঁর নিজ গ্রাম মহিষখোলার নাম পরিবর্তন করে ‘নূর মোহাম্মদ নগর’ রাখা হয়। 

বর্তমানে সেখানে নির্মিত হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজ। জাদুঘর ছাড়াও তাঁর বসতভিটায় নির্মাণ করা হয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ।শার্শার মাটিতে সমাহিত এই বীর সন্তানের অবদান আজও লাল-সবুজের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে অমলিন।


প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024