গোয়ালন্দে শিক্ষকতার পাশাপাশি পেঁপে চাষে সাফল্য


দুই বিঘা জমিতে শাহী পেঁপের বাম্পার ফলন, ৫ লাখ টাকা বিক্রির আশা




রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজ করে সাফল্যের মুখ দেখছেন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা জহির রায়হান। দুই বিঘা জমিতে শাহী জাতের পেঁপে চাষ করে এবার বাম্পার ফলন পেয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে বাগানে বিপুল পরিমাণ পেঁপে ধরেছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এ বাগান থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রির আশা করছেন তিনি। এতে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে তিন লাখ টাকার বেশি লাভ হতে পারে বলে আশা তার।


জহির রায়হান গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মৃধাডাঙ্গা গ্রামের মোতালেব শেখের ছেলে। তিনি স্থানীয় ৬ নম্বর রিয়াজউদ্দিন পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শখের বশে কৃষিকাজ করে আসছেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চলতি বছর দুই বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে শাহী জাতের পেঁপের বাগান গড়ে তুলেছেন।


সরেজমিনে দেখা যায়, সারি সারি পেঁপেগাছে ঝুলছে অসংখ্য পেঁপে। গাছের গোড়া থেকে শুরু করে ওপরের অংশ পর্যন্ত ফলন হয়েছে। বাগানের পরিচর্যা, সেচ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত সময় দিচ্ছেন জহির রায়হান। শিক্ষকতার ব্যস্ততার মধ্যেও অবসর সময়ে তিনি নিজেই বাগানের দেখভাল করেন।


জহির রায়হান জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের চাষ করে আসছেন। কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকেই এবার পেঁপে চাষের উদ্যোগ নেন।


তিনি বলেন, “আমি পেশায় একজন শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি শখের বসে কৃষিকাজ করি। প্রায় ১০ বছর ধরে বিভিন্ন মৌসুমি ফসল চাষ করছি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার দুই বিঘা জমিতে শাহী পেঁপের বাগান করেছি। সেখানে প্রায় ২০০টি চারা রোপণ করেছি। এ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আল্লাহর রহমতে ফলনও হয়েছে প্রচুর। আশা করছি, বাগান থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করতে পারব।”


তবে সরকারি সহায়তা না পাওয়ার আক্ষেপও রয়েছে এই কৃষি উদ্যোক্তার। তিনি বলেন, “সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা পাইনি। এমনকি কৃষি বিভাগের কেউ মাঠে এসে বাগানের খোঁজও নেননি। তবে বিভিন্ন বীজ কোম্পানির প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন।”


উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, শাহী পেঁপে উচ্চ ফলনশীল ও সুমিষ্ট স্বাদের একটি বারোমাসি জাত। বাণিজ্যিক চাষাবাদের জন্য জাতটি বেশ জনপ্রিয়। এ জাতের গাছের উচ্চতা সাধারণত ১ দশমিক ৬ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। গাছের কান্ডের নিচের অংশ থেকেই ফল ধরা শুরু হয়। ফল দেখতে ডিম্বাকৃতির এবং প্রতিটি ফলের ওজন সাধারণত ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। উপযুক্ত পরিচর্যা, সার ও সেচ নিশ্চিত করা গেলে হেক্টরপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব। চারা রোপণের পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যেই ফলন শুরু হয়।


গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৈয়দ রায়হানুল হায়দার বলেন, পেঁপে একটি সম্প্রসারণশীল ফল। নতুন উদ্যোক্তারা দিন দিন পেঁপে চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। চলতি মৌসুমে গোয়ালন্দ উপজেলায় প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে পেঁপের আবাদ হয়েছে।


জহির রায়হানের বাগান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওনারা একটি গোছানো বাগান করেছেন। বাগানের পেঁপে ফল হিসেবে বিক্রি করায় ভালো দাম পাচ্ছেন। বর্তমানে মৌসুমি ফলের সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় এ সময় পেঁপে ফল হিসেবে ভালো বাজার পাচ্ছে।”


তিনি আরও বলেন, “এটি হাইব্রিড জাত নয়, উফশী জাত। ফলে ফল থেকে বীজ সংরক্ষণ করে কৃষক কিংবা আশপাশের অন্য চাষিরা চারা উৎপাদন করে পরবর্তী সময়ে বাগান করতে পারবেন।”


পেঁপে চাষে জলাবদ্ধতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, উঁচু জমিতে কিংবা পুকুরের পাড়ে সারিবদ্ধভাবে পেঁপে চাষ করলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। গোয়ালন্দের ভৌগোলিক অবস্থান পেঁপে চাষের জন্য বেশ সম্ভাবনাময় বলেও মনে করেন তিনি।


তার ভাষ্য, গোয়ালন্দের আশপাশে বেশ কয়েকটি বড় বাজার রয়েছে। পাশাপাশি রাজবাড়ী ও ফরিদপুরের বাজারে সহজে পেঁপে সরবরাহ করা যায়। পদ্মা নদী পার হয়ে রাজধানী ঢাকার বাজারেও তুলনামূলক সহজে পণ্য নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে সঠিক পরিকল্পনা ও পরিচর্যার মাধ্যমে এখানকার কৃষকরা পেঁপে চাষ করে ভালো লাভ করতে পারেন।


কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, গোয়ালন্দ উপজেলার জমির উর্বরতা ভালো। জহির রায়হান ও তার ভাই শাখাওয়াতের মতো উদ্যোক্তাদের অনুসরণ করে অন্য কৃষকরাও পরিকল্পিতভাবে পেঁপে চাষে এগিয়ে এলে এ অঞ্চলে পেঁপে চাষ আরও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


স্থানীয় কৃষকদের মতে, শিক্ষকতার পাশাপাশি জহির রায়হানের এ ধরনের কৃষি উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার। সঠিক পরামর্শ, আধুনিক প্রযুক্তি ও সরকারি সহযোগিতা পেলে গোয়ালন্দে বাণিজ্যিক পেঁপে চাষ আরও বিস্তৃত হয়ে কর্মসংস্থান ও কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024