মোংলা প্রতিনিধিঃ 


‎বাংলাদেশ রেলওয়ের সাম্প্রতিক এক বৈঠকে মোংলা-ঢাকা রুটে একজোড়া নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করবে।


‎দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে মোংলা-ঢাকা রুটে একজোড়া নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। গত ২৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত রেলওয়ের মাসিক পর্যালোচনা সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় এবং পরবর্তীতে ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টি গণমাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই উচ্চপর্যায়ের সভায় মোংলা বন্দরের সাথে রাজধানী ঢাকার সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন এবং উপকূলীয় অঞ্চলের দীর্ঘদিনের যাতায়াত সংকট নিরসনে এই নির্দেশিকা জারি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের যোগাযোগ মানচিত্রে এক বিশাল রূপান্তর ঘটে যাবে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।


‎দীর্ঘদিন ধরে মোংলা ও এর আশেপাশের অঞ্চলের যাত্রীদের রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের জন্য সড়ক পথের ওপর অতিরিক্তমাত্রায় নির্ভর করতে হতো, যা প্রায়ই সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল এবং জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াত। বিশেষ করে মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও রেল যোগাযোগের অনুপস্থিতিতে তা ব্যাহত হচ্ছিল। সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, সড়কপথে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা, যানজট এবং অতিরিক্ত ভাড়ার চাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও রেলযোগাযোগের এই নতুন উদ্যোগ তাদের সেই দীর্ঘমেিয়াদী ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার এক বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করবে। রেলওয়ের এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধুমাত্র যাত্রী সাধারণই উপকৃত হবে না, বরং মোংলা বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও এর একটি ইতিবাচক ও দূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা জোরালোভাবে আশা প্রকাশ করছেন।


‎রেলওয়ের মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই পর্যালোচনা সভায় কেবল মোংলা-ঢাকা রুটই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক রেল নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন ও সেবার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে আরও কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সভায় নাজিরহাট লোকাল ট্রেনকে কমিউটার ট্রেনে উন্নীত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনকে সার্কুলার রুটে চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া নরসিংদী কমিউটার ট্রেনের অব্যবহৃত রেক ব্যবহার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত নতুন একজোড়া কমিউটার ট্রেন চলাচলের বিষয়ে কারিগরি মতামত চাওয়ার সিদ্ধান্তও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এই বহুমুখী পদক্ষেপে সামগ্রিক রেল খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর পাশাপাশি সেবার মান উন্নত করার একটি স্পষ্ট বার্তা ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।


‎মোংলা-ঢাকা রুটে এই আন্তঃনগর ট্রেন চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা দেশের সামগ্রিক পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সড়ক পথের ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপ কমার পাশাপাশি যাত্রীরা একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আরামদায়ক যাতায়াত মাধ্যম লাভ করবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে। তবে এই মহৎ উদ্যোগ যেন কোনো ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা বা প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় থমকে না যায়, সে বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ তদারকি বজায় রাখতে হবে। ট্রেন চালুর এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হলে তা সরকারের রেলওয়ে খাতের আধুনিকায়ন রূপকল্পকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে সন্দেহ নেই।


প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024