|
Date: 2026-09-14 02:20:18 |
মুন্সি শাহাব উদ্দীন, চট্টগ্রাম:
চুল কাটবে বলে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিল ১২ বছরের শিশু রায়হান। সেই টাকা নিয়ে সেলুনে যাওয়ার বদলে অভিমানে বাড়ি ছেড়ে কক্সবাজারে চলে যায় সে। কে জানত, এই সামান্য অভিমানই তাকে ঠেলে দেবে এক ভয়ংকর অন্ধকার জগতে! কে জানত, ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া সেই শিশুটি সাত মাস পর বাবার কাছে ফিরবে কিন্তু ফিরবে একটি পা হারিয়ে!
কক্সবাজারে গিয়ে রায়হান পড়ে একটি ভিক্ষাবৃত্তি পরিচালনাকারী চক্রের হাতে। চক্রের সদস্যরা তাকে ট্রেনের ছাদে করে ঢাকায় নিয়ে যায়। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে রায়হান। কিন্তু সকালে ঘুম ভাঙতেই তার জীবনে নেমে আসে নির্মম বাস্তবতা ডান পা নেই!
নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে শিশুটি। কীভাবে হারাল তার পা কিছুই বুঝতে পারছিল না সে। তখন চক্রের সদস্যরা তাকে জানায়, ট্রেনে আসার সময় পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছিল রায়হান। পরে তার পা কেটে ফেলতে হয়েছে। শিশুমনও তাদের সেই কথা বিশ্বাস করে নেয়।
এরপর শুরু হয় রায়হানের জীবনের আরেক নির্মম অধ্যায়। এক পায়ে দাঁড় করিয়ে তাকে নামানো হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। চক্রের সদস্যরা তাকে ভিক্ষা করতে উৎসাহিত করত। এমনকি ভিক্ষা করে পাওয়া টাকা জমিয়ে রাখার জন্য কিনে দেওয়া হয় একটি মাটির ব্যাংকও।
এভাবেই সাত মাস ধরে রাজধানীর কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করে বেড়িয়েছে রায়হান। আর অন্যদিকে বুকের ভেতর সন্তান হারানোর শূন্যতা নিয়ে দিন কাটিয়েছেন তার বাবা নাজিম উদ্দিন।
অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। তবে আনন্দের সঙ্গে মিশে গেল সীমাহীন কান্না।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতিতে সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলের মাঠে ভিক্ষা করছিল রায়হান। হঠাৎ দূর থেকে তাকে দেখতে পান বাবা নাজিম উদ্দিন। প্রথমে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না নিজের চোখকে। কাছে গিয়ে যখন নিশ্চিত হলেন এটাই তার হারিয়ে যাওয়া ছেলে, তখন আর নিজেকে সামলাতে পারেননি তিনি।
এক পা হারানো সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বাবা। সাত মাসের অপেক্ষা, সন্তানের জন্য অস্থিরতা আর হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট সব যেন এক মুহূর্তে চোখের পানিতে বেরিয়ে আসে।
রায়হান চুনতি ইউনিয়নের দক্ষিণ সাতগড় নোয়াপাড়ার অটোরিকশাচালক নাজিম উদ্দিনের ছেলে।
জানা গেছে, রায়হানকে একটি মাদ্রাসার হেফজ বিভাগে ভর্তি করেছিলেন তার বাবা। তবে পড়াশোনায় সে ছিল অনিয়মিত। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সৎমায়ের সংসারেও কমবেশি অবহেলার শিকার ছিল রায়হান। একপর্যায়ে প্রায় সাত মাস আগে চুল কাটার জন্য বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সে।
রায়হান জানায়, ওই টাকা নিয়ে সে কক্সবাজারে চলে যায়। সেখানে তার সঙ্গে পরিচয় হয় একটি দালাল চক্রের সদস্যদের। তারা তাকে ট্রেনের ছাদে করে ঢাকার কমলাপুরে নিয়ে যায়। সেখানে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে সে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায়, তার ডান পা নেই। নিজের শরীরের এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন চক্রের সদস্যরা তাকে জানায় ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে সে গুরুতর আহত হয়েছিল এবং পরে তার পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এরপর তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো হয়। ভিক্ষা করে উপার্জন করা টাকা জমিয়ে রাখার জন্য তাকে একটি মাটির ব্যাংকও কিনে দেওয়া হয়।
এভাবেই গত সাত মাস রাজধানীর কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এক পায়ে ভিক্ষা করে কাটিয়েছে শিশুটি।
এরপর চুনতিতে ১৯ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলে ভিক্ষার জন্য রায়হানকে নিয়ে আসে ওই চক্রের সদস্যরা। আর সেখানেই ঘটে যায় জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি।
হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরে পান বাবা। তবে যে সন্তানকে তিনি সাত মাস ধরে সুস্থ শরীরে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, তাকে ফিরে পেলেন এক পা হারানো অবস্থায়।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দিন বলেন, “শনিবার রাতে চুনতি সীরাতুন্নবীর মাঠে হঠাৎ আমার ছেলেকে দেখতে পাই। কাছে গিয়ে দেখি, তার ডান পা হাঁটু পর্যন্ত কাটা। আমার ছেলে দালাল চক্রের হাতে পড়েছিল। তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো হয়েছে। এক পা হারিয়ে আমার ছেলে আজ আবার আমার বুকে ফিরেছে।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত এই বাবা দালাল চক্রের সদস্যদের দ্রুত খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
তিনি বলেন, তার ছেলের মতো আর কোনো শিশু যেন এমন নির্মমতার শিকার না হয়। কোনো বাবা-মায়ের ঘর থেকে সন্তান হারিয়ে গিয়ে যেন এভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ফিরতে না হয়।
এ বিষয়ে লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ বলেন, “এ বিষয়ে আমি কিছু শুনিনি। পরিবারের লোকজন আইনি সহায়তা চাইলে আইনিভাবে সহায়তা করা হবে।”
একটি শিশুর জীবনের স্বপ্ন ছিল, ছিল একটি ঘর, ছিল বাবা-মায়ের ভালোবাসা। সাত মাস পর সে ঘরে ফিরেছে ঠিকই কিন্তু তার শৈশবের এক টুকরো যেন চিরতরে হারিয়ে গেছে সেই অন্ধকারের পথে। বাবার বুক ফিরে পেলেও, হারানো পা আর ফিরে পাবে না রায়হান
© Deshchitro 2024