সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নের টিকেট গ্রামের রঘুনাথপুর মৌজায় পৈতৃক ভিটাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা ও উত্তরাধিকার দাবি, স্থানীয়ভাবে সালিশ-মীমাংসার উদ্যোগ, অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভূমিকা নিয়ে এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দিলীপ মণ্ডলের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে।

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, টিকেট গ্রামের রঘুনাথপুর মৌজায় বৈষ্ণব বৈদ্যের ছেলে গৌর ও গোপালের নামে থাকা পৈতৃক ভিটাকে কেন্দ্র করেই বিরোধের সূত্রপাত। পরিবারের সদস্য সুভদ্রা একসময় ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে দেশে ফিরে তিনি পৈতৃক ভিটায় নিজের অধিকার দাবি করলে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিরোধ নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা ও সালিশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মীমাংসার আলোচনার সময় সুভদ্রা তার ভাই ও ভাইপোদের কাছ থেকে প্রথমে ৫ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আরও ২০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অর্থ লেনদেনের প্রকৃত কারণ ও শর্ত কী ছিল, তা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।


পৈতৃক ভিটা নিয়ে বিরোধের ঘটনায় সুভদ্রার অবস্থান ও দাবি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, তিনি পৈতৃক সম্পত্তিতে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে তার বক্তব্য সরাসরি পাওয়া না যাওয়ায় এসব অভিযোগের বিষয়ে তার অবস্থান জানা সম্ভব হয়নি।

এদিকে, সুভদ্রাকে পৈতৃক ভিটায় ফেরানোর জন্য দিলীপ মণ্ডল ফোনে চাপ দিয়েছেন—এমন অভিযোগও স্থানীয়ভাবে উঠেছে। তবে দিলীপ মণ্ডল আদৌ এ ধরনের কোনো চাপ দিয়েছেন কি না, সুভদ্রার সঙ্গে তার যোগাযোগের কারণ কী ছিল এবং বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে তার কোনো ভূমিকা ছিল কি না—এসব বিষয়ে নিশ্চিত হতে তার বক্তব্য প্রয়োজন।

দিলীপ মণ্ডলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

পৈতৃক ভিটা নিয়ে বিরোধের মধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দিলীপ মণ্ডলের নাম আসায় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের একাংশ তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তার সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা নথি এখনো পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় দিলীপ মণ্ডলের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কেন সুভদ্রার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, বিরোধ মীমাংসায় তার ভূমিকা কী ছিল এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তিনি কী বলতে চান—এসব প্রশ্নের উত্তর তার বক্তব্যের মাধ্যমেই পরিষ্কার হতে পারে।


বর্তমান পৈতৃক ভিটা বিরোধের পাশাপাশি দিলীপ মণ্ডলকে ঘিরে অতীতে প্রকাশিত একটি অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।


ওই প্রতিবেদনে টিকেট গ্রামের মৃত কানাই লাল মণ্ডলের ছেলে দিলীপ মণ্ডলকে ঘিরে অরবিন্দ বিশ্বাস নামে এক ব্যক্তির বয়স্ক ভাতার টাকা উত্তোলনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অরবিন্দ বিশ্বাস জমিজমা বিক্রি করে সপরিবারে ভারতে চলে যাওয়ার পরও তার নামে বরাদ্দকৃত বয়স্ক ভাতার টাকা উত্তোলনসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দিলীপ মণ্ডলকে কুলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ এবং কুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আসাদুল ইসলামকে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানানোর কথাও উল্লেখ ছিল।

তবে পুরোনো ওই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের লেনদেনের রেকর্ড, সমাজসেবা কার্যালয়ের নথি এবং ভাতা উত্তোলনের তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। শুধু পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন বা অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায় না।


পৈতৃক ভিটা নিয়ে বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে জমিটির প্রকৃত মালিকানা, উত্তরাধিকার এবং সীমানা। স্থানীয়ভাবে আলোচনার সময় পানি শুকিয়ে গেলে জমি পরিমাপ করে সীমানা নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আইনগতভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট খতিয়ান, দলিল, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের রেকর্ড, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং জমির সীমানা যাচাই করা প্রয়োজন। এসব নথি পরীক্ষা করলেই কার কতটুকু মালিকানা বা উত্তরাধিকার রয়েছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।

বিশেষ করে সুভদ্রা দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থান করে থাকলে পৈতৃক সম্পত্তিতে তার বর্তমান আইনগত অধিকার কী—এ বিষয়টিও প্রচলিত আইন, উত্তরাধিকার বিধান ও সংশ্লিষ্ট জমির নথিপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।


ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা সুভদ্রার বসবাসরত এলাকায় গিয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়ভাবেও তার কোনো মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার সরাসরি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে দিলীপ মণ্ডলের বক্তব্যও এ ঘটনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার বিরুদ্ধে ওঠা ফোনে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ, সুভদ্রার সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং পুরোনো বয়স্ক ভাতার অভিযোগ সম্পর্কে তার অবস্থান জানা গেলে পুরো বিষয়টির একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র পাওয়া যেতে পারে।


নিজস্ব প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে পৈতৃক ভিটা নিয়ে বিরোধ, অর্থ লেনদেনের দাবি, সুভদ্রাকে ঘিরে অভিযোগ এবং দিলীপ মণ্ডলের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না।

ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে জমির খতিয়ান ও দলিল, নামজারি ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত কাগজপত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের লেনদেনের তথ্য, সমাজসেবা কার্যালয়ের নথি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।

অভিযুক্ত দিলীপ মণ্ডলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সুভদ্রার বক্তব্যও নেওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024