সাতক্ষীরা পৌরসভাধীন ঐতিহ্যবাহী নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শৃঙ্খলা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান দাবি করেছেন তারা।

অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে গেছে, নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না এবং সম্প্রতি আবারও ক্লাস রুটিন পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে তাদের দাবি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয়টির বর্তমান প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মালেক গাজী ২০১৪ সালের ৯ জুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর যোগদানের সময় বিদ্যালয়টির অবকাঠামো ও আর্থিক পরিস্থিতি নাজুক ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তখন শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০ জন, ভবনের বিভিন্ন অংশ জরাজীর্ণ, পর্যাপ্ত বেঞ্চ ও চেয়ার ছিল না, বিজ্ঞানাগারে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল এবং স্যানিটেশন ও সুপেয় পানির ব্যবস্থাও ছিল সীমিত।

প্রধান শিক্ষক ও তাঁর সমর্থকদের দাবি, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত প্রায় ১২ বছরে বিদ্যালয়টির অবকাঠামো, শিক্ষার্থী সংখ্যা, ফলাফল, আর্থিক সক্ষমতা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০ জন। বিদ্যালয়ে ৮০০ জোড়ার বেশি বেঞ্চ, চারতলা ভবন, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, ২৬টি ওয়াশরুম, দুটি ওয়াশ ব্লক, দুটি গভীর নলকূপ, ৪৮টি সিসি ক্যামেরা, হলরুম, ক্যান্টিন, ফটোকপি মেশিন এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক তহবিল রয়েছে।

তাদের আরও দাবি, একসময় বিদ্যালয়ের তহবিলে প্রায় ২১ হাজার টাকা থাকলেও প্রায় দেড় লাখ টাকা ঋণ ছিল। বর্তমানে বিদ্যালয়ের তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকার মতো অর্থ রয়েছে এবং কোনো ঋণ নেই। তবে এই অর্থ ও তহবিলকে কেন্দ্র করেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বলে প্রধান শিক্ষক দাবি করেছেন।

শিক্ষার ফলাফলের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, যোগদানের আগে ১৪ বছরে বিদ্যালয় থেকে ২১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (এ+) পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রায় ১২ বছরে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় ২৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালে ৫৫ জন শিক্ষার্থী এ+ পাওয়াসহ শতভাগ পাস ছিল এবং আনন্দ র‍্যালি করা হয়। একই সঙ্গে পৌরসভা, উপজেলা ও জেলার বালিকা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বিদ্যালয়টি একাধিকবার প্রথম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বিজ্ঞান বিভাগেও শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। আগে নবম ও দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল ১০-১৫ জনের মতো। বর্তমানে এ সংখ্যা ১১০ থেকে ১২০ জনে উন্নীত হয়েছে বলে বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা জানান।

শুধু একাডেমিক কার্যক্রম নয়, বিতর্ক, আবৃত্তি, গান, নাচ, উপস্থাপনা, খেলাধুলা, বিজ্ঞান প্রজেক্টসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও বিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শিক্ষা সপ্তাহে জাতীয় পর্যায়ে গান ও উপস্থাপনায় অংশগ্রহণ এবং বিজ্ঞান প্রজেক্টে জাতীয় পুরস্কার অর্জনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বর্তমানে প্রধান শিক্ষক দায়িত্বে না থাকায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাদের একজন অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে গেছে এবং নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে আবার ক্লাস রুটিন পরিবর্তনের বিষয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। নিজের মেয়ের ক্ষতির আশঙ্কায় নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ওই অভিভাবক বলেন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ দ্রুত স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।

এদিকে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীর দাবি, কয়েকজন শিক্ষক ও বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। এর মধ্যে অনৈতিক সুবিধা না দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না করা, দেরিতে বিদ্যালয়ে আসা কিংবা শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহারের মতো বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে গেলে বিরোধ তৈরি হয়। এমনকি যশোর শিক্ষা বোর্ডের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে একজন শিক্ষককে পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি সাময়িক বরখাস্ত করেছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তে বাথরুম তালাবদ্ধ রাখার মতো অভিযোগও আনা হয়েছে। তিনি এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, তাঁর চাকরিজীবনের প্রায় ২৮ বছর অতিবাহিত হয়েছে এবং গুরুতর কোনো অনিয়ম থাকলে সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সাতক্ষীরাবাসীর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের স্বার্থে দ্রুত বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

তিনি সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, দ্রুত শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত, পাঠদান কার্যক্রম স্বাভাবিক এবং বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হোক। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের অর্জন ও সুনাম ধরে রেখে ভবিষ্যতে আরও উন্নত পরিবেশ তৈরির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

অভিভাবকদেরও দাবি, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস, উপস্থিতি, নিরাপদ পরিবেশ ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশা তাদের।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024