|
Date: 2026-09-15 21:17:57 |
একজন অভিভাবকের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান শিক্ষার কথাই ধরা যাক—বইয়ের তত্ত্ব, ব্যবহারিক খাতা এবং বাস্তব জীবনে বিজ্ঞানের প্রয়োগ; এই তিনটির মধ্যে এখনো বড় রকমের সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পড়ছে, ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে এবং সনদও পাচ্ছে; কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই বিজ্ঞানের প্রয়োগ কীভাবে করতে হয়, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণা থাকছে না। এই প্রশ্নটি কেবল বিজ্ঞান শিক্ষার নয়, আমাদের পুরো শিক্ষাকাঠামোর জন্যই প্রযোজ্য। আমরা পরীক্ষায় পাস করিয়ে সার্টিফিকেট বিতরণ করছি ঠিকই, কিন্তু সেই শিক্ষা তরুণদের কতটা দক্ষ ও আত্মনির্ভরশীল করতে পারছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষ করে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। মাদ্রাসা থেকে পড়ালেখা শেষ করার পর অনেক শিক্ষার্থীই কর্মজীবনের প্রতিযোগিতায় নিজেদের দক্ষতা নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা অনুভব করে। তাদের ধারণা, সাধারণ শিক্ষা ধারায় পড়লে চাকরির বাজারে টিকে থাকার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। ফলে উচ্চমাধ্যমিক বা তার পরবর্তী পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষায় স্থানান্তরিত হওয়ার এক স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটিকে কেবল একটি ধারার দিকে ঝুঁকে পড়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এর পেছনে রয়েছে ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে শিক্ষার্থীদের বাস্তবসম্মত চিন্তা। তারা এখন জানতে চায়—কোন শিক্ষা তাদের চাকরির বাজারে টিকিয়ে রাখবে এবং স্বাবলম্বী হওয়ার সক্ষমতা জোগাবে।
তবে মাদ্রাসা শিক্ষার সম্ভাবনাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন কেবল এই শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞান, ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বাস্তবমুখী কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটানো গেলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রে সমানভাবে আলো ছড়াতে পারবে। এর ইতিবাচক উদাহরণও আমাদের সামনে রয়েছে। মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বিসিএস ক্যাডার হয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন—এমন নজির আজ নতুন আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।
বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা কেবল ‘কোথায় পড়ব’ তা ভাবছে না, বরং ‘কী শিখব’ এবং ‘কীভাবে দক্ষ হব’ সে প্রশ্ন তুলছে। তাই শিক্ষার সাফল্যের মানদণ্ডও এখন বদলে ফেলার সময় এসেছে। শুধু জিপিএ বা সনদের সংখ্যা দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ না করে দেখতে হবে একজন শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে কতটা পারদর্শী। মাদ্রাসা হোক কিংবা সাধারণ শিক্ষা—সব ধারারই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সনদসর্বস্ব শিক্ষার বিপরীতে এমন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করতে পারবে এবং দেশের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
© Deshchitro 2024