শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বরখাস্ত সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর সেলিমের স্থগিত এমপিও ছাড়াতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে জাল চিঠি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই তারিখে জারি করা ওই চিঠিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-৩ শাখার তৎকালীন উপসচিব হিসেবে সোনা মনি চাকমার নাম ও স্বাক্ষর রয়েছে।


তবে সোনা মনি চাকমা জানিয়েছেন, চিঠিটি জাল। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট জারি শাখাতেও এ ধরনের কোনো চিঠি জারির তথ্য পাওয়া যায়নি।


বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়ায় চিঠিটির সত্যতা যাচাই করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) গত ১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে মাউশি।


২০২৪ সালের ৩১ জুলাইয়ের কথিত চিঠিতে হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে মো. জাহাঙ্গীর সেলিমের স্থগিত এমপিও ছাড় করার জন্য মাউশির মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়।


চিঠিতে স্মারক নম্বর হিসেবে ৩৭.০০.০০০০,০৭৪,০২৯.০০৫.২০২০-২৪১ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-৩ শাখার উপসচিব হিসেবে সোনা মনি চাকমার নাম ও স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে।


কিন্তু বর্তমানে জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (যুগ্মসচিব) হিসেবে কর্মরত সোনা মনি চাকমা বলেন, ওই চিঠিতে তার নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হলেও সেটি তিনি জারি করেননি।


তিনি বলেন, ‘ওই চিঠিটি জাল। ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই আমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলাম না। তখন আমি বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম।’


সোনা মনি চাকমা আরও জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, ওই তারিখে এ ধরনের কোনো চিঠি জারি করা হয়নি। চিঠিতে তাকে উপসচিব হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তিনি তখন যুগ্মসচিব পদে কর্মরত ছিলেন বলেও জানান।


চিঠিটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়ার পর মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে যাচাই চেয়ে চিঠি পাঠান।


মাউশির চিঠিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাইয়ের কথিত স্মারকে হাজী অছি আমরুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর সেলিমের স্থগিত এমপিও ছাড় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিকতর সতর্কতার জন্য চিঠিটির সত্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক বলেন, ‘শাখা থেকে চিঠি তোলা হয়েছিল। চিঠিটি যাচাই করতে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠির উত্তর আসলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


অধিদফতর সূত্র জানায়, চিঠিটির বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় এর সত্যতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।


জাহাঙ্গীর সেলিমের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও এমপিও পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চলছে। ২০১৩ সালে প্রধান শিক্ষক পদে তার নিয়োগের কাগজপত্রে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির স্বাক্ষরসহ বিভিন্ন নথি জাল করার অভিযোগ ওঠে।


তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তার এমপিও স্থগিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে মামলা ও আদালতকেন্দ্রিক বিভিন্ন কার্যক্রম চলে। এরই মধ্যে তিনি কারাভোগও করেন।


২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার স্থগিত বেতন-ভাতা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক উম্মে কুলসুম হাইকোর্টে রিট করেন। পরে বিষয়টি আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়ায়। ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর আপিল বিভাগে মামলাটিতে ‘নো অর্ডার’ হয়। এরপরও বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে এমপিও ছাড়ার উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হয়েছে।


বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উম্মে কুলসুম। তার অভিযোগ, জাহাঙ্গীর সেলিমের নিয়োগ ও এমপিওসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তিনি আদালতের আদেশ থাকা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেতন-ভাতা তুলতে পারছেন না।


উম্মে কুলসুম বলেন, ‘সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে প্রধান শিক্ষক পদের জন্য জাহাঙ্গীর সেলিম এমপিও ছাড় করিয়েছিলেন। পরে তার জালিয়াতি ধরা পড়ে এবং এমপিও স্থগিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তার বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলাও হয়েছে।’


তার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে।


মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সোনা মনি চাকমা অতীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সুযোগে তার নাম, স্বাক্ষর ও পুরোনো দায়িত্বের পরিচয় ব্যবহার করে কথিত চিঠিটি সরকারি আদেশ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।


তবে চিঠিটি কারা তৈরি করেছে, কে এটি ব্যবহার করেছে এবং কীভাবে সেটি মাউশিতে পৌঁছেছে—এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।


জাহাঙ্গীর সেলিমের স্থগিত এমপিও ছাড়ের জন্য ব্যবহৃত কথিত চিঠিটি মাউশিতে কীভাবে পৌঁছেছে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, চিঠিটি সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে তোলা হয়েছিল। সন্দেহ দেখা দেওয়ার পর এর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে চিঠির বিষয়ে উত্তর পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’


এদিকে, জাহাঙ্গীর সেলিমের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি ‘নামাজে যাচ্ছি’ বলে ফোন কেটে দেন। পরে মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।


চিঠিটির সত্যতা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করার পরই এর উৎস, ব্যবহারকারী এবং দায়ীদের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট হবে।

প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024