|
Date: 2026-09-27 13:07:40 |
কিছু স্বপ্ন চোখে দেখা যায় না, তবু সেই স্বপ্নই মানুষকে ঘুমাতে দেয় না। দূর দিগন্তের হাতছানি তখন বুকের ভেতর অদৃশ্য এক আলো জ্বেলে রাখে। সেই আলোকে পথের দিশারি করে কুতুবদিয়ার মাটির সন্তান এ.কে.এম. সেলিম রেজা পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর জাপানে। সঙ্গে ছিল না কোনো রাজকীয় আয়োজন; ছিল মেধা, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর নিজের সামর্থ্যকে প্রমাণ করার এক দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলা বড়ঘোপ ইউনিয়নের উত্তর অমজাখালী গ্রামের সেই ছেলেটিই আজ ড. এ.কে.এম. সেলিম রেজা, জাপানের Kanazawa University থেকে Computational Mathematics-এ পিএইচডি অর্জন করে যিনি নিজের নামের পাশে জুড়েছেন এক অনন্য অর্জনের অধ্যায়।
এ অর্জন যেন একদিনে ফুটে ওঠা কোনো ফুল নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিচর্যা, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই, নির্ঘুম রাত আর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর সাধনা।
যাত্রা শুরু কুতুবদিয়ার মাটি থেকে তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রথম পাঠ Kutubdia Model High School-এ। ২০০৭ সালে এসএসসি এবং ২০০৯ সালে Chittagong Government City College থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর স্বপ্নের পালে আরও একটু হাওয়া লাগিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে। সেখান থেকে ২০১৩ সালে স্নাতক এবং ২০১৫ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
শুধু বইয়ের পাতায় মেধার পরিচয় রেখে থেমে থাকেননি তিনি। কর্মজীবনেও নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ২০১৬ সালে Green University of Bangladesh-এ প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরের বছর, ২০১৭ সালে, যোগ দেন Khulna University of Engineering & Technology (KUET)-এ। অধ্যাপনার পথ ধরে ২০২০ সালে অর্জন করেন সহকারী অধ্যাপকের পদ।
কিন্তু যার চোখে দূর আকাশের নীল, তার কাছে এক দিগন্ত কখনো শেষ দিগন্ত নয়।
তারপর সূর্যোদয়ের দেশ জাপানের নতুন আকাশের নিচে নতুন লড়াই, ২০২৩ সালে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার স্বপ্নকে আরও বিস্তৃত করতে পাড়ি জমান জাপানে। পেছনে পড়ে থাকে পরিচিত মাটি, আপনজন, চেনা ভাষা ও চেনা জীবন। সামনে তখন অচেনা দেশ, অচেনা সংস্কৃতি, নতুন ভাষা আর কঠিন একাডেমিক বাস্তবতা।
কিন্তু স্বপ্নের কাছে দূরত্বের হিসাব চলে না। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে শুরু করেন গবেষণার কঠিন পথচলা। তাঁর গবেষণার বিষয়—“Invariant Theory and Its Application”। গণিতের বিমূর্ত জগতের জটিল সূত্র, তত্ত্ব ও প্রয়োগের গভীরে প্রবেশ করে বছরের পর বছর সাধনা চালিয়ে অবশেষে তিনি ছুঁয়ে ফেলেন সেই কাঙ্ক্ষিত শিখর—পিএইচডি ডিগ্রি।
সাফল্য একার নয়
একজন মানুষের অর্জনের পেছনে অনেক মানুষের নীরব ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। সেলিম রেজার এই সাফল্যের পথেও রয়েছে পরিবার, শিক্ষক, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের দোয়া, ভালোবাসা ও সহযোগিতা।
জাপানের অধ্যায় শেষ করে এবার তাঁর ফিরে আসার পালা। দেশে ফিরে KUET-এ শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বিদেশের মাটিতে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলো ছড়িয়ে দিতে চান দেশের শিক্ষাঙ্গনে।
কুতুবদিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামের যে মাটিতে তাঁর শৈশবের পদচিহ্ন, সেই মাটি আজ নিশ্চয়ই তার এই অর্জনে গর্বিত। কারণ, দ্বীপের চারপাশে যতই জলরাশি থাকুক, স্বপ্নের কোনো সীমানা নেই।
একদিন কুতুবদিয়ার একটি ছোট্ট ঘর থেকে যে স্বপ্ন যাত্রা শুরু করেছিল, আজ তা পৌঁছে গেছে জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম একাডেমিক অঙ্গনে।
সেলিম রেজার নিজের কথাতেই যেন পুরো গল্পটির সারাংশ—“পরিশ্রম করলে, পরিশ্রমের ফল কখনো বিফলে যায় না।”কুতুবদিয়ার মাটি থেকে জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়—এ শুধু একজনের পিএইচডি অর্জনের গল্প নয়; এটি স্বপ্নকে বুকের ভেতর বাঁচিয়ে রাখার, প্রতিকূলতাকে জয় করার এবং মেধার শক্তিতে নিজের ঠিকানা নির্মাণের গল্প।
© Deshchitro 2024