বাগেরহাটের মোংলায় সুন্দরবনের শেলা নদী এলাকায় কোস্ট গার্ডের বিশেষ অভিযানে ছয়টি একনলা বন্দুকসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।
সুন্দরবনের শেলা নদী ফরেস্ট অফিসসংলগ্ন এলাকায় গত ৭ অক্টোবর রাতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একটি বিশেষ দল সফল অভিযান পরিচালনা করে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কোস্ট গার্ড বেইস মোংলার সদস্যরা রাত আটটার দিকে ওই এলাকায় অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন ও অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ডের অংশ হিসেবে ঝটিকা অভিযান চালায়। অভিযানে ছয়টি একনলা বন্দুক, তিনটি এয়ারগান, একটি পাইপগানের ট্রিগার এবং ১৪ রাউন্ড তাজা কার্তুজ জব্দ করা হয়েছে। সুন্দরবনের গহিনে দস্যুদলের অবস্থানের খবর পেয়ে কোস্ট গার্ডের চৌকস দলটি তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পৌঁছালে ডাকাতদলের সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত বনের গভীরে আত্মগোপন করে। ফলে ঘটনাস্থল থেকে কোনো দস্যুকে আটক করা সম্ভব হয়নি, তবে উদ্ধারকৃত এই বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের হুমকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূলত বনদস্যুদের তৎপরতা দমন ও সুন্দরবনের অভয়ারণ্য এলাকায় চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য রুখতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের পর কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানান, উদ্ধারকৃত এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ দস্যুরা কোনো বড় ধরনের ডাকাতির প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মজুত করেছিল। সুন্দরবনকেন্দ্রিক জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের অভিযোগ অনুযায়ী, এই ডাকাতদলগুলো নিয়মিতভাবে বনের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাঁদাবাজি ও লুটতরাজ চালায়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, দস্যুরা আধুনিক ও দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে থাকে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অস্থিরতায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জননিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট যে, বনদস্যুরা বনের গহিন এলাকাকে তাদের সুরক্ষিত আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে এবং বন বিভাগের টহল এড়িয়ে তারা অভিনব কৌশলে অস্ত্র লুকিয়ে রাখছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং অপরাধীদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারি নির্দেশনা ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় সুন্দরবনকে শতভাগ দস্যুমুক্ত করতে তারা বদ্ধপরিকর। যদিও দস্যুরা অভিযানের সময় পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, তবুও উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো তাদের সক্ষমতা ও নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশকে অকার্যকর করে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বন বিভাগের সাথে সমন্বিত টহল এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ালে দস্যুদের এই আস্তানাগুলো স্থায়ীভাবে ধ্বংস করা সম্ভব। তবে প্রশাসনের দাবি সত্ত্বেও বনদস্যুদের নেটওয়ার্ক ভাঙতে স্থানীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সুন্দরবনের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং দস্যুতা নির্মূলে কোস্ট গার্ডের এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে অভিযানের পরও দস্যুরা অধরা থেকে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে বড় ধরনের কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। সুন্দরবনের মতো একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ইকোসিস্টেম সুরক্ষায় অস্ত্রের চালান বন্ধ করা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ধারাবাহিক অভিযান যদি অব্যাহত না থাকে, তবে বনদস্যুরা আবারও তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠন করার সুযোগ পেতে পারে। তাই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য বাহিনীর সমন্বিত ও কঠোর অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই।