সারাদেশে দ্বিতীয়! জাতীয় যুব পুরস্কার-২০২৬ অর্জন করলেন লালপুরের রায়হান ‎আবু তালেব' লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি : ‎স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সাহস, পরিশ্রম, দূরদর্শিতা ও মানুষের জন্য কাজ করার আন্তরিকতা। এসব গুণকে পুঁজি করে একের পর এক উদ্যোগ গড়ে তুলে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন নাটোরের লালপুর উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা মোঃ আব্দুল মোত্তালেব রায়হান। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও যুবসমাজের উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি জাতীয় যুব পুরস্কার-২০২৬-এ সফল আত্মকর্মী ক্যাটাগরিতে সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। ‎ ‎রোববার (১ নভেম্বর) রাজধানী ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর আয়োজিত জাতীয় যুব দিবসের অনুষ্ঠানে তাঁকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘দক্ষ যুব গড়বে দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’। ‎ ‎লালপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা রায়হানের বাবা মো. মজিবর রহমান এবং মা মোছা. রওশনআরা বেগম। ‎ ‎২০১৪ সালে যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ছয়টি গরু নিয়ে গরুর খামার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে কৃষি, মৎস্য, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, ব্যাংকিং, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে তাঁর রয়েছে একাধিক উদ্যোগ। ‎ ‎মৎস্য খাতে নিজের সফলতার পাশাপাশি স্থানীয় চাষিদের মাছ বিক্রির সমস্যা সমাধানে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সোনার বাংলা মৎস্য আড়ত’। ‎ ‎অন্যদিকে, মিশ্র ফলবাগানে অর্গানিক পদ্ধতিতে বিষমুক্ত ফল উৎপাদন এবং ‘আশার আলো জৈব সার কারখানা’র মাধ্যমে ট্রাইকো কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে কৃষি ও পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে ভূমিকা রাখছেন। তাঁর জৈব সার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটিতে বসবাসরত রাশিয়ান নাগরিকদের জন্য উৎপাদিত শাকসবজি ও ফল চাষেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সার কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৩০ জনের। ‎ ‎তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘লিড টপার’ ও ‘হলিটেক আইটি’। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৩০০ তরুণ প্রশিক্ষণ নিয়ে আয়ের সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান দুটিতে প্রায় ৫০ জন কর্মরত এবং ১০০ জন প্রশিক্ষণরত রয়েছেন। ‎ ‎লালপুরের কৃষকদের সেচসংকট নিরসনে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও উদ্যোগের মাধ্যমে ২৪টি গভীর নলকূপ স্থাপনে সহযোগিতা করেছেন তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ডক্টরস পয়েন্ট অ্যান্ড ডায়াবেটিক সেন্টার’, যেখানে প্রায় ২০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। ‎ ‎প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে ইসলামী ব্যাংকের গোপালপুর ও আব্দুলপুরে দুটি এজেন্ট শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২০ ও ২০২১ সালে চালু হওয়া শাখা দুটিতে ১৪ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ ছাড়া জনতা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির লালপুর অফিসের মাধ্যমে প্রায় আট বছর ধরে ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহন এবং পিএসপি এক্সপ্রেস প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে কুরিয়ার সেবা দিয়ে আসছেন। এসব উদ্যোগেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ‎ ‎ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও সক্রিয় রায়হান। তিনি গ্রীন লালপুর প্রকল্পের সমন্বয়ক, গ্রীন ভয়েসের লালপুর উপজেলা শাখার উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) লালপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি। এসব সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবছর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার ফলজ ও বনজ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করেন। ‎ ‎২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় মাস্ক বিতরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় অসহায় ও আক্রান্ত মানুষের বাড়িতে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেন। এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছ থেকে সম্মাননাও লাভ করেন। ‎ ‎শিক্ষা ও মানবিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। আর্থিক সংকটে উচ্চশিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়া মেরিনা, ফাতেমা, সানজিদা ও প্রার্থনাসহ একাধিক মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। পাশাপাশি প্রাকৃতি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় এবং তাঁর সভাপতিত্বে লালপুরের দুর্গম পদ্মার চরাঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে ‘আলোর দরজা শিশু বিদ্যা নিকেতন’। ‎ ‎সাংবাদিকতার মাধ্যমেও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যা ও অনিয়ম তুলে ধরেছেন তিনি। বিভিন্ন অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি প্রতিকার আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ২০ বছরের পুরোনো সরকার টেক্সটাইল স্থানান্তরের প্রতিবাদ এবং সামাজিক বনায়নের গাছ রোপণের অনিশ্চয়তা নিরসনেও তাঁর নেতৃত্বে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এ ছাড়া গণমানুষের কথা তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠা করেছেন স্থানীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘লালপুর বার্তা’। ‎ ‎ছাত্রাবস্থা থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি), বাংলাদেশ স্কাউটস, রোভার স্কাউটসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন। সাংবাদিকতা বিষয়েও গ্রহণ করেছেন একাধিক প্রশিক্ষণ। ‎ ‎রায়হানের এসব উদ্যোগে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে শতাধিক মানুষের। তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থান, কৃষকদের সহায়তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। ‎ ‎সারাদেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জনের এই স্বীকৃতি শুধু মোঃ আব্দুল মোত্তালেব রায়হানের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং লালপুরের জন্যও গর্বের বিষয়। তাঁর এ সাফল্যে স্থানীয় সচেতন মহল ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, তাঁর এই অর্জন নতুন প্রজন্মকে আত্মকর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও সমাজের কল্যাণে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করবে।
প্রকাশক : কাজী জসিম উদ্দিন   |   সম্পাদক : ওয়াহিদুজ্জামান

© Deshchitro 2024