|
Date: 2026-11-01 21:35:40 |
কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনেক দিন ধরেই বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। এটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স । এই চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রে কেবল তাড়াইল উপজেলার মানুষ আসে তা নয়, বরং পার্শ্ববর্তী উপজেলার মানুষেরও প্রতিনিয়ত আগমন ঘটে থাকে । সময়ের সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ কিন্তু সেই অনুযায়ী বাড়েনি চিকিৎসা সেবার মান। পর্যাপ্ত আসন না থাকায় প্রতিনিয়ত অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে চিকিৎসা সেবা নিতে হয়। অনেক সময় প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমান আধুনিকতার যুগে এখনও তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য সেবা পিছিয়ে রয়েছে। তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত ডাক্তার,ঔষধ, অ্যাম্বুলেন্স ও নিত্যপ্রয়োজনীয় আধুনিক উপকরণ নেই। ফলে এই উপজেলার মানুষকে প্রতিনিয়ত শহরের চিকিৎসা কেন্দ্রে যেতে হয়। ফলাফল স্বরূপ, চিকিৎসা ব্যয় বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, হাসপাতালের ভিতরে প্রায় সময় ময়লা-আবর্জনায় নোংরা পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং টয়লেট নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না । এছাড়াও সম্প্রতি, হাসপাতালের সামনে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে।
এতে প্রতিনিয়ত হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মানও ক্ষুন্ন হচ্ছে । এছাড়াও চিকিৎসক যখন তার নিজ চেম্বারে রোগী দেখতে যায় তখন তারা অনেক রোগীদের সিরিয়াল আগে থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে পিছনের সিরিয়ালে থাকা রোগীদের কে আগে ডাক্তারের নিকট নিয়ে যায়। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা সেবা নেওয়া অনেকের জন্য খুবই কষ্টদায়ক হয়ে পড়ে। আবার হাসপাতালের সামনে অসংখ্য দালাল চক্রের কারণে অনেক সময় রোগীদের ব্যবস্থাপত্র টানাটানিতে ছিঁড়ে যায়। ফলে অনেক রোগীদের চরম বিড়ম্বনার সম্মুখীন হয়। অন্যদিকে অনেক কক্ষে প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক পাখা না থাকার কারণে রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনেক চিকিৎসক হাসপাতালে নিয়মিত নির্ধারিত সময়ে প্রবেশ করে না এবং নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই তাদের নিজস্ব চেম্বারে বসে রোগীদের চিকিৎসা করেন। ফলে অনেকেই টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও তাদের নিজ চেম্বারে চিকিৎসা সেবা নিতে হয়। বিশেষত, বর্ষাকালে সামান্য বৃষ্টিতেই জানালার ভিতর দিয়ে পানি প্রবেশ করে। ফলে রোগীদের বিছানা সহ পুরো রুম হাসপাতাল ভিজে যায়। ফলাফল স্বরূপ আরও ভোগান্তি প্রতিনিয়ত বেড়ে যায়। অনেক সময় প্রতিনিয়ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে পুরো হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। রোগীদের আরও অভিযোগ, হাসপাতালের খাবারের মানও অত্যন্ত নিম্নমানের । সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ না থাকায় প্রায় রোগীদের হাসপাতালের বাইরে থেকে ঔষধ ক্রয় করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা।
বিশেষ করে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তাদের নিজস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিভিন্ন পরীক্ষা করতে হয়। এতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। যে সকল স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মিত হাসপাতালের ভেতরে হওয়ার কথা ছিল সেগুলোর মধ্যে অনেক পরীক্ষায় অতিরিক্ত খরচে বাইরে থেকে করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় তুলনায় চিকিৎসক কম থাকায় হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসকদের উপরেও অতিরিক্ত চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে ।
এতে রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দিয়ে চিকিৎসা সেবাও প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরাজীর্ণ অবস্থা দেখলে মনে হয় এখনও সেই মান্ধাতার আমলে পড়ে রয়েছে। এমতাবস্থায় স্বাস্থ্য সেবাকে আরও জটিল করে তুলছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকট উত্তরণে করণীয় কি? এই সংকট সমাধানে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, হাসপাতালের আসন সংকট নিরসনে প্রয়োজনে ৫০ থেকে অন্তত ১০০ শয্যা বিশিষ্ট করা এখন সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, পর্যাপ্ত ডাক্তার,ঔষধ, অ্যাম্বুলেন্স ও নিত্যপ্রয়োজনীয় আধুনিক উপকরণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিচ্ছন্ন কর্মী নিয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, নির্বিঘ্ন চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য নির্মূল করতে হবে । পঞ্চমত, চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময়ে নিয়মিত চিকিৎসা কেন্দ্র আসতে হবে। ষষ্ঠত, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক পাখা সংযোগ করতে হবে। সপ্তমত, কোন ভাবেই ডাক্তাররা যেন ব্যক্তিগত চেম্বারে বসতে না পারে, বরং প্রয়োজনে হাসপাতালে সেবার সময় বৃদ্ধি করতে হবে। অষ্টমত, হাসপাতালে অবকাঠামোগত সংস্কার করা জরুরি। একটি দেশ তখনই উন্নতির শীখরে পৌঁছাতে পারে যখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নত হয়। গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন ব্যতিরেকে একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করাও মুশকিল।
নবমত, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বক্ষণিক টহল ও রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, হাসপাতালের খাবার মানসম্মত করতে হবে এবং প্রশাসনিক প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
মোঃ শরীফুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি।
© Deshchitro 2024