কোহিনূর হীরা
কোহিনূর বা আলোর পর্বত নামে খ্যাত হীরার ইতিহাস অতি দীর্ঘ এবং বর্ণাঢ্য। এর ইতিহাসের সূচনা ১৩০৪ সালে। প্রাচীনকালের সুন্দরী কুমারীর মতো এটিও বিভিন্ন রাজা বাদশাহ ও শাসকের হাত ঘুরে এখন স্থান পেয়েছে টাওয়ার অফ লন্ডনে।ষোড়শ শতাব্দীতে কোহিনূর মালওয়ার রাজাদের অধিকারে ছিল এবং পরবর্তীকালে তা মোগল সম্রাটদের হাতে আসে এবং সম্রাট শাহজাহান নির্মিত ময়ূর সিংহাসনের শোভা বর্ধন করে। মোগল সাম্রাজ্য যখন বিক্ষিপ্ত ও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে তখন নাদির শাহকে আমন্ত্রণ জানানো হয় মুসলিম শাসনের গৌরবোজ্জ্বল দিন ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করতে। কিন্তু তাকে প্রতিশ্রুত অর্থ না দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়। কৌশলে তিনি মোগলদের কাছ থেকে কোহিনূর উদ্ধার করে নিয়ে যান ইরানে। কোহিনূর নামটিও নাদির শাহের দেয়া। নাদির শাহ নিহত হবার পর কোহিনূর আসে আফগানিস্তান সম্রাট হুমায়ুনের পুত্রের কাছে।পঞ্জাবের মহারাজা রঞ্জিত সিংহ আফগান শাসকের থেকে কোহিনুর হিরে পেয়েছিলেন। তিনি তা উইল করে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরকে দিয়ে কোহিনূর বা আলোর পর্বত নামে খ্যাত হীরার ইতিহাস অতি দীর্ঘ এবং বর্ণাঢ্য। এর ইতিহাসের সূচনা ১৩০৪ সালে। প্রাচীনকালের সুন্দরী কুমারীর মতো এটিও বিভিন্ন রাজা বাদশাহ ও শাসকের হাত ঘুরে এখন স্থান পেয়েছে টাওয়ার অফ লন্ডনে।
দ্বিতীয় ব্রিটিশ-শিখ যুদ্ধের পর শিখদের হারিয়ে ব্রিটিশরা শিখ সাম্রাজ্য দখল করে। তার জন্য লর্ড ডালহৌসি লাহৌরের শেষ চুক্তি তৈরি করেন। সেই চুক্তিতেই কোহিনুর-সহ মহারাজার যাবতীয় সম্পত্তি ইংল্যান্ডের মহারানি ভিক্টোরিয়াকে সমর্পণের কথা বলা হয়েছিল।উত্তরসূরি দলীপ সিংহ ১৮৫০-এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে এ’টি তুলে দেন। শেষ পর্যন্ত সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮৫০ সালে তুলে দেন রাণী ভিক্টোরিয়ার হাতে। ১০৮.৯৩ ক্যারট ওজনবিশিষ্ট কোহিনূর প্রথমে রাণী ভিক্টোরিয়া ব্যবহার করতেন তার হাতে। এরপর সেটি স্থান পায় বৃটিশ মুকূটে। উপমহাদেশের এক সময়ের অহংকার এখন বৃটেনে।১৮৫০-এ দলীপ সিংহ ছিলেন নাবালক। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, নাবালক রাজাকে চাপ দিয়ে কোহিনুর নেওয়া হয় । এবং সেই যুক্তিতেই ১৯৪৭-এ স্বাধীনতার সময় এবং তার পরে ১৯৫৩ সালেও বর্তমান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেকের সময় কোহিনুর ফেরানোর দাবি তুলেছে ভারত। কিন্তু চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তা খারিজ করে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।কোহিনূরের মালিকানা নিয়ে আশির দশকেও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ইরান, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, এমনকি বাংলাদেশ পর্যন্ত এর সত্ত্ব দাবি করেছিল। তবে বৃটিশ সরকার সব দাবিই প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এসকল দাবী অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করেছে।

দরিয়া-ই-নূর
দরিয়া-ই-নূর আলোর নদী বা আলোর সাগর বিশ্বের অন্যতম বড় হীরকখন্ড, যার ওজন প্রায় ১৮২ ক্যারেট ৩৬ গ্রাম। এটির রঙ গোলাপি আভাযুক্ত, এ বৈশিষ্ট্য হীরার মধ্যে খুবই দূর্লভ। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের সোনালি ব্যাংকে রয়েছে যা ঢাকায় অবস্থিত।কোহিনূর হীরার মত দরিয়া-ই-নূর হীরাটিও গোলকোন্দা খনি, আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের পরিতলা-কোল্লুর খনি থেকে পাওয়া যায়। খুঁজে পাওয়ার পরেই হীরাটি মুঘল সম্রাটের দখলে যায়।১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্রারস্যের শাসক নাদির শাহ ভারতের উত্তরাঞ্চল আক্রমণ করে দিল্লী দখল করে নেয় এবং বহু দিল্লীবাসীকে হত্যা করে। মূঘল সম্রাট মোহাম্মদের কাছে রাজশক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে নাদির শাহ কোহিনূর হীরা, ময়ূর সিংহাসনের সাথে দরিয়া-ই-নূর সহ মুঘল সম্রাটের সম্পূর্ণ বিপুল ধন-রত্নে পরিপূর্ণ কোষগার দখল করে নেয়। নাদির শাহ এ সমস্ত ধনরত্ন তার সাথে করে ইরান নিয়ে যান এবং দারিয়া-ই-নূর সেই থেকে সেখানেই রয়েছে।নাদের শাহের মৃত্যুর পরে তার দৌহিত্র শাহরুখ মির্জা উত্তরাধিকার সূত্রে দরিয়া-ই-নূরের মালিক হন। এরপর এটি আলম খান খোজেইমেহের দখলে আসে এবং পরে পারস্যের ঝান্ড সম্রাজ্যের সদস্য লুতফ্ আলি খান ঝান্ডের দখলে আসে। কাজার সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আগা মোহাম্মদ খান ঝান্ডদের যুদ্ধে পরাজিত করলে দরিয়া-ই-নূরও কাজারদের দখলে চলে আসে। ফাতেহ আলি শাহ কাজার তার নাম হীরা এক পিঠে খোদাই করান। পরবর্তীতে নাসের-আল-দীন শাহ কাজার এটি প্রায়ই তার বাহুবন্ধনীতে পড়তেন। তিনি বিশ্বাস করতে এটি হীরা সাইরাস রাজমুকুটকেও সুশোভিত করেছিল। যখন রাজকীয় রীতিতে বাহুবন্ধনীর রেওয়াজ কমে আসে তখন তিনি এটি তার পোষাকে পিনের সাথে পরিধান করতেন। বিভিন্ন সময়ে এই রত্ন সম্মানের প্রতীক হিসেবে রাজ্যের সম্মানী ব্যাক্তিদের কাছে গচ্ছিত রাখা হয়েছে। ১৯০২ সালে ইউরোপ ভ্রমণের সময় শাসক মোজাম্মর আল-দীন শাহ কাজার এ হীরাটি তার হ্যাটের অলঙ্কার হিসেবে পরিধানের আগ পর্যন্ত এটি গুলিস্তান প্রাসাদের কোষগারে লুকায়িত ছিল। পাহলভি সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা রেজা শাহ ১৯২৬ সালে তার রাজ্যভিষেকের সময় এই হীরাটি তার সামরিক টুপিতে অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহার করেন, এবং ১৯৬৭ সালেও মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির রাজ্যভিষেক অনুষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়।১৯৬৫ সালে কানাডীয় এক গবেষক দলের প্ররস্যের রাজমুকুটের রত্ন সম্পর্কিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, দরিয়া-ই-নূর একোটি বড় গোলাপি হীরার অংশ ছিল এবং তা মুঘল সম্রাট শাহজাহানের সিংহাসনে খচিত ছিল। ফরাসি জহোরি জিন-বাপ্টিস্ট তাভেরনিয়ের ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দের এক জার্নালে এ সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে, যিনি একে Diamanta Grande Table নামে ডেকেছেন। হীরাটি হয়তো দুই ভাগে কাটা হয়েছে বড় ভাগটি দরিয়া-ই-নূর অর্থাৎ আলোর সাগর, ছোট অংশটি নূর-উল-আইন হীরা যার ওজন মনে করা হয় ৬০ ক্যারেট ১২ গ্রাম, যা বর্তমানে ইরানের ইম্পেরিয়াল কালেশনে একটি টায়রায় খচিত রয়েছে।

নূর-উল-আইন
নূর-উল-আইন আলোর চোখ ইরানের সম্রাজ্ঞী ফারাহ পাহলভির জন্য তৈরি টায়রায় খচিত প্রধান হীরক খন্ড। টায়রাটি ১৯৫৮ সালে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিয়ের সময় তৈরি করা হয়েছিল। মনে করা হয় এটি ভারতের গোলকোন্দা খনি থেকে উত্তোলন করা হয়েছিল এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে নাদির শাহ আফসার ভারত জয় করে ইরানের ইম্পেরিয়াল কালেকশনে নিয়ে আসেন।এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গোলাপি হীরক খন্ড এবং মনে করা হয় তা আরও বড় একটি গোলাপি হীরক খন্ডের অংশ ছিল। ঐ বড় হীরক খন্ডটি দুই ভাগ করা হয় যার একটি অংশের নাম হয় নূর-উল-আইন এবং অন্যটি হয় দরিয়া-ই-নূর হীরা। দুটো অংশই এখন ইরানের মুকুটের রত্নের অংশ।
শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভামা। সত্যভামার পিতা সত্রাজিৎ। তিনি একবার সাগরপাড়ে বসে সূর্যদেবতার আরাধনা করছিলেন। দেবতা প্রার্থনায় খুশি হয়ে তাকে স্বরূপ দেখালেন। কিন্তু সত্রাজিৎ দেবতাকে ঠিকমতো দেখতে পারছিলেন না। তিনি দেবতাকে বললেন, ‘প্রভু, আকাশে আপনি আগুনের পিণ্ডের ন্যায় হাজির হন। আমার সামনে একইভাবে হাজির হলে এই চক্ষু কি আপনাকে দেখতে পাবে?’
সূর্যদেবতা তখন স্যমন্তক নামে একটি উজ্জ্বল মণি গলায় পরেছিলেন। ভক্তের কথা শুনে তিনি মণিটি খুলে ফেললেন। সত্রাজিৎ তখন তাকে দেখতে পেলেন। সূর্যদেবতার চোখের রং বাদামি হলুদ, শরীর ছোট এবং তামাটে। সত্রাজিৎ মাথা নিচু করে সম্মান প্রদর্শন করলেন। খুশি হয়ে দেবতা তাকে বর চাইতে বললেন। সত্রাজিৎ তখন ওই স্যমন্তকটি চাইলেন এবং পেয়েও গেলেন।
এরপর সত্রাজিৎ গর্ব এবং খুশিতে দ্বারকাবাসীগণকে সেই মণি দেখার আমন্ত্রণ জানালেন। চারপাশে মণিটির প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ল। শ্রীকৃষ্ণও সেই মণির কথা শুনে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। কিন্তু তিনি যখন স্যমন্তক মণি দেখতে চাইলেন তখন সত্রাজিৎয়ের ভয় হলো। তিনি ভাবলেন, বাসুদেব মণির কথা শুনে প্রলুব্ধ হয়েছেন এবং সেটি অপহরণ করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে দেখতে চেয়েছেন। ভয়ে ভয়ে শ্রীকৃষ্ণকে তিনি মণিটি দেখালেন বটে, কিন্তু মনে মনে শ্রীকৃষ্ণের নামে কলঙ্ক রটানোর পরিকল্পনা করলেন। সত্রাজিৎয়ের বাড়ি থেকে যাওয়ার পথে সত্যভামার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাৎ ঘটে। সত্যভামাকে দর্শন করা মাত্র শ্রীকৃষ্ণ পরম প্রীত হন এবং তার প্রতি প্রণয়াসক্ত হয়ে তাকে কামনা করেন। সত্রাজিৎতনয়াও শ্রীকৃষ্ণের বলদৃপ্ত, তেজোদীপ্ত অপূর্ব মনোহর কান্তি দেখে এবং তাকে সুচতুর বাকপটুত্বের সঙ্গে রসালাপ করতে দেখে বিমুগ্ধ হন এবং তাকে পতিরূপে কামনা করেন।
সম্রাট শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসন
ওদিকে শ্রীকৃষ্ণ বাড়ি থেকে প্রস্থান করামাত্র সত্রাজিৎ তার ভাই প্রসেনকে স্যমন্তক মণিটি দিয়ে তাকে আত্মগোপন করে থাকতে বললেন। এরপর তিনি দ্বারকায় প্রচার করে দিলেন, স্যমন্তক মণি অপহৃত হয়েছে এবং দ্বারকেশ্বর দেবকীনন্দন মণিটি দেখে চলে যাওয়ার পরেই মণিটি আর পাওয়া যাচ্ছে না। একথা শ্রবণমাত্র শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ঘটনার প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হলেন। বহু অন্বেষণের পর তিনি এক দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে ভল্লুকরাজ জাম্ববানের কাছে স্যমন্তক মণির সন্ধান পেলেন। শ্রীকৃষ্ণ মণিটি তার কাছে প্রার্থনা করলে জাম্ববান দিতে অস্বীকার করলেন। জাম্ববান বললেন, যদি যাদবশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণ তাকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করতে পারে তবেই তিনি মণি দেবেন। শ্রীকৃষ্ণ শর্তে সম্মত হলেন এবং বললেন, যদি জাম্ববান মল্লযুদ্ধে তার কাছে পরাভব স্বীকার করে, তবে স্যমন্তক মণির সঙ্গে জাম্ববানের পরমাসুন্দরী কন্যা জাম্ববতীকেও বাসুদেবের কাছে সমর্পণ করতে হবে। যথানিয়মে মল্লযুদ্ধ শুরু হলো। জাম্ববান বীর হলেও মহাবলবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পারলেন না। ফলে স্যমন্তক মণি এবং জাম্ববতীকে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন করলেন। দ্বারকার পৌর পরিষদে শ্রীকৃষ্ণ যখন সকল কথা বিবৃত করলেন তখন দ্বারকার সকল বিশিষ্ট নাগরিক এই রায় দিলেন যে এই মণি এখন শ্রীকৃষ্ণের, সত্রাজিৎয়ের এর উপর আর কোনো অধিকার নেই। তখন সত্রাজিৎ ভুল স্বীকার করলেন এবং বললেন যে, প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ তিনি তার একমাত্র কন্যা সত্যভামাকে শ্রীকৃষ্ণের হাতে প্রদান করবেন। শ্রীকৃষ্ণও মনে মনে তাই চাইছিলেন। তিনি সত্যভামাকে গ্রহণ করলেন কিন্তু স্যমন্তক মণি ফিরিয়ে দিলেন।
দুই.
অনেকের ধারণা এই স্যমন্তক মণি আর কোহিনূর একই। পাঁচ হাজার বছর আগেই পুরাণে এভাবেই কোহিনূরের উল্লেখ ছিল। অনেকে মনে করেন, কাকাতিয়া রাজবংশের দেবীমন্দিরে দেবীর চোখ হিসেবে কোহিনূর ব্যবহার করা হতো। সবার বিশ্বাস, আলোচনা, দ্বন্দ্ব নিয়েই কোহিনূর এখনো পৃথিবীবাসীর কাছে ঐতিহাসিক এক রহস্যের নাম।
কোহিনূর হীরার সন্ধান পাওয়া যায় তেরো শতাব্দীতে। গবেষকদের মতে, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টার জেলার সন্তোষনগর অঞ্চলের কল্লর খনি থেকে এই হীরা উত্তোলন করা হয়। কোহিনূরের সঙ্গে ‘দরিয়া–ই–নূর’ নামে আরেকটি হীরাও তখন উত্তোলন করা হয়। এটিকে কোহিনূরের যমজ বলা হয়ে থাকে। এর অর্থ ‘পর্বতের আলো’। কোহিনূরের প্রাথমিক ওজন ছিল ৭৯৩ ক্যারেট। কিন্তু ভেনিসের হীরা কর্তনকারী হরটেনসিও জর্জিস অদক্ষতার কারণে কোহিনূর কেটে ছোট করে ফেলেন। এর বর্তমান ওজন ১০৫ ক্যারেট। ১৩০৪ সালে রাজা মালওয়া এই হীরা অধিকরণ করেন। তার আগ পর্যন্ত কেউ এই হীরাকে কোহিনূর নামে ডাকত না। ১৩০৪ সালেই দিল্লির সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির হাতে চলে আসে কোহিনূর। ১৩৩৯ সালে হীরাকে সমরখন্দ শহরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে এটি প্রায় ৩০০ বছর ধরে অবস্থান করছিল। ১৩০৬ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দি লিখনে, যারা হীরাটি পরেন তাদের একটি অভিশাপ দেয়া হয়: ‘এই হীরার যে মালিক হবে সে তার দুভার্গ্য সম্পর্কেও জানতে পারবে। শুধু ঈশ্বর বা কোনো মহিলা পরলে তার উপর কোনো অভিশাপ কাজ করবে না।’ মোগল আমলে এটি সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। যে কারণে মোগল শাসকবৃন্দ কোহিনূরের প্রতি বিশেষ যত্নবান ছিলেন। শাসকদের অধিকারে কোহিনূর ২১৩ বছর ছিল। পরে আফগানদের কাছে ৬৬ বছর ও ব্রিটেনের অধিকারে ১৩৪ বছর পার করে হীরকখণ্ডটি। এটি বর্তমানে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সম্পত্তি হিসেবে রয়েছে।
রানী এলিজাবেথের মুকুটে শোভা পাচ্ছে কোহিনূর
কোহিনূর নামটি মোগলদের দেয়া। ফারসি শব্দ কোহ–ই–নূর শব্দটি থেকে শব্দটির উদ্ভব। পর্তুগিজ চিকিৎসক ও দার্শনিক গার্সিয়া দা ওরতো’র রচনায় কোহিনূর সম্পর্কে বলা হয়েছে। তিনি ১৫৬১ সালে প্রকাশিত ‘কোলোকুইজ অন দ্য সিম্পলস অ্যান্ড ড্রাগস অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে বলেছেন, ভারতবর্ষের বৃহত্তম হীরা বিজয়নগরে সংরক্ষিত আছে। ধারণা করা হয়, তিনি কোহিনূরের কথাই হয়তো বলেছেন।
‘বাবরনামা’তে কোহিনূর সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। এ গ্রন্থে বাবর লিখেছেন, গোয়ালিয়রের রাজা বিক্রমজিতের পরিবারকে গ্রেফতার করার পর তারা হুমায়ূনকে কিছু রত্ন দিয়েছিল। বাবরের প্রশংসাকারীরা বলেন, এই রত্নের মধ্যে থাকা একটি হীরার মূল্য দিয়ে পুরো দুনিয়ার মানুষকে আড়াই দিন খাওয়ানো যাবে। বাবর বর্ণিত এই একটি হীরাই হচ্ছে কোহিনূর। মোগল আমলে এটিকে ‘বাবরের হীরা’ বলা হতো। পানিপথের যুদ্ধের পর বাবরকে কোহিনূর হীরা উপহার দিয়েছিলেন পুত্র হুমায়ূন। হুমায়ূন আহমেদের ‘বাদশা নামদার’ উপন্যাসেও এই ঘটনার উল্লেখ আছে। বাবর বা হুমায়ূন কেউ এ হীরাকে অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহার করেননি। সম্রাট শাহজাহান এসে প্রথমবারের মতো ময়ূর সিংহাসনের অলঙ্কার হিসেবে কোহিনূর ব্যবহার করেন। পরে পারস্যের নাদির শাহ কোহিনূর লুট করেন। ১৭৪৭ সালে নাদির শাহর মৃত্যুর পর এটি আফগানিস্তানের আমির আহমদ শাহ দুররানির কাছে ছিল। পরবর্তীতে কোহিনূরের মালিক হন আহমদের বংশধর শাহ সুজা দুররানি। বহু ঘটনা শেষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত জয় করলে কোহিনূর চলে যায় ব্রিটেনের রানীর দরবারে। গবেষকরা স্থান বিবেচনায় কোহিনূরের ভ্রমণ পথ চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, কোহিনূর বহু দেশ ও স্থান ভ্রমণ করেছে। কোহিনূর খনিতে তৈরি হয় পাঁচ হাজার বছর আগে, গুল্টারে। তারপর ১৩০৪ সালে এটি মালওয়া, ১৩০৬ সালে অরুগাল্লু, ১৩২৩ সালে দিল্লি, ১৩৩৯ সালে সামরখান্দ, ১৫২৬ সালে দিল্লি, ১৭৩৯ সালে পারস্য, ১৮০০ সালে পাঞ্জাব, ১৮৪৯ সালে লাহোর, ১৮৫০ সালে যুক্তরাজ্য এবং বর্তমানে এটি টাওয়ার অব লন্ডনে রয়েছে।
তিন.
পারস্যের নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করে লুটে নেন ময়ূর সিংহাসনসহ এই কোহিনূর। কিন্তু কোহিনূর বেশি দিন ভাগ্যে সইল না তার। আত্মীয়দের হাতে খুন হন নাদির শাহ। হীরা চলে যায় আফগান জেনারেল আহমেদ শাহ দুররানীর কাছে। নাদির শাহর লাশ দেখার সময় কায়দা করে তার সিলটা হাত করেন দুররানী এবং সেই সূত্রে মালিক হন কোহিনূরের। তার মৃত্যুর পর হীরা আসে তার সন্তান তিমুর শাহ-এর কাছে। তিমুরের কাছ হতে জামান শাহর হাত হয়ে কোহিনূর চলে যায় সুজা উল মূলকের কাছে। তিমুর শাহর ছোট সুজা উল মূলক সৎ ভাই মাহমুদের কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীরের গভর্নর আতা মুহাম্মদ খানের কাছে বন্দি হন ১৮১১ সালে। কিন্তু পাঞ্জাবের শিখ রাজা রঞ্জিত সিং সুজাকে উদ্ধার করেন এবং তাকে পরিবারসমেত লাহোর পাঠিয়ে দেন। বদৌলতে সুজা উল মূলক ১৮১৩ সালে রঞ্জিত সিংয়ের হাতে তুলে দেন কোহিনূর। রঞ্জিত সিং মারা যাওয়ার পর হীরার মালিক হন তার ১১ বছরের ছেলে মহারাজ দিলীপ। কিন্তু ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা পাঞ্জাব দখল করে নেয়। সেই সঙ্গে দিলীপের হাত থেকে কেড়ে নেয় কোহিনূর।
পারস্যের নাদির শাহ ময়ূর সিংহাসনসহ কোহিনূর লুট করেন
কোহিনূরের অভিশাপ নিয়ে প্রচুর গল্প বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে আছে। বলা হয়, যে শাসকের অধীনে এ হীরাটি ছিল সেই হারিয়েছে তার সাম্রাজ্য, ধন–দৌলত। সম্রাট বাবর থেকে শুরু করে ব্রিটিশ রাজা পর্যন্ত, যিনিই এ হীরাটির অধিকারী হয়েছেন তার জীবনে নেমে এসেছে দুর্গতি। সিংহাসনচ্যুত, সংঘাত, রক্তারক্তি, খুনাখুনির ইতিহাস তাই কোহিনূরের সাথে গাঢ়ভাবে জড়িয়ে আছে। কোহিনূরকে ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে নেয়ার পথে কম ভোগান্তি হয়নি ব্রিটিশদের। এই ইতিহাসটুকু না বললেই নয়।
১৮৫০ সালের ১২ জানুয়ারি ডালহৌসি কোহিনূর ব্রিটেনে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ৬ এপ্রিল কোহিনূরকে নিয়ে জলপথে রওনা দেয়া হয়। কোহিনূর নেয়া হচ্ছিল ব্রিটেনের রানীর জাহাজ মিডিয়ায়। যাত্রার কদিন পরেই জাহাজে যেন অভিশাপ লাগে। কলেরার মহামারিতে এসময় ১৩৫ জন ক্রু মারা যান। এটাই শেষ নয়। জাহাজটি এরপর ঝড়ের কবলে পড়ে। অনেক বিপত্তি শেষে ৩০ জুন মিডিয়া প্লাইমাউথ বন্দরে পৌঁছে। ওই সময় বিট্রিশ ও অন্যান্য সংবাদপত্রগুলো কোহিনূরের অভিশাপ নিয়ে লিখতে থাকে। ব্রিটেন যাওয়ার পর কোহিনূরের অন্য একটি বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার হয়। সেটি হলো— কোহিনূর কেবল পুরুষ শাসকদেরকেই অভিশাপ দিয়ে থাকে। নারীরা তার অভিশাপ থেকে আনুকূল্য পায়। যার কারণে কোহিনূরের অভিশাপ রানী এলিজাবেথের ক্ষেত্রে কোনো কাজে লাগেনি। কোহিনূরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো— এর ৩৩টি পাশ রয়েছে। এর রং শ্বেতশুভ্র। কোহিনূরকে সবচেয়ে নিখুঁতভাবে কাটা হীরা মনে করা হয়। এর বর্তমান মূল্য ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড বা ১২ শ’কোটি টাকা। এটির মালিকানা নিয়ে এখনো দ্বন্দ্ব রয়েছে। ভারতবাসী মনে করে, ব্রিটিশরা কোহিনূর চুরি করে বা পাচার করে নিয়ে গেছে। ১৯৩৭ সালে আরো ২৮০০টি হীরার সাথে কোহিনূর ব্রিটিশ রাজ মুকুটে যুক্ত করা হয়। বর্তমানে লন্ডন টাওয়ারে জনসাধারণের সামনে প্রদর্শনীর জন্য অন্যান্য বিখ্যাত হীরা ও রত্ন পাথরের সাথে কোহিনূর রাখা আছে।
কোহিনূরের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। এর বড় কারণ হচ্ছে কোহিনূর কখনো বিক্রি হয়নি। কখনো উপহার দেয়া হয়েছে, কখনোবা কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে। তারপরও আমরা কিছু ধারণার জন্য পাশাপাশি অন্য বিখ্যাত হীরার সাথে তুলনা করে দেখতে পারি। গ্রাফপিংক হীরা (Graff Pink) যার ওজন ২৫ ক্যারেটের কম, যা কোহিনূর হীরার ৪ ভাগের এক ভাগ। প্রায় ৬০ বছর আগে হংকং-এ হীরাটি বিক্রি হয়েছিল ৪৬ মিলিয়ন ডলার। ৫০ বছর পূর্বেও কোহিনূরের আনুমানিক মূল্য ২০০ মিলিয়ন ডলার ধারণা করা হচ্ছিল। যদিও ব্রিটিশ রাজ পরিবার কোহিনূরের মূল্য ১০ থেকে ১২.৭০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছে। আসলে এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
পাঞ্জাবের শিখ রাজা রঞ্জিত সিং সুজার মণিমুক্তা
চার
কোহিনূরের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব বহু পুরোনো। ভারত, পাকিস্তান, ইরান এবং আফগানিস্তান মনে করে কোহিনূর তাদের। ইংল্যান্ডের কাছে তারা বিভিন্ন যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেছিল এই ব্যাপারে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হয়নি। ১৮৫০ সালে দিলীপ সিংহ ছিলেন নাবালক। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, নাবালক রাজাকে চাপ দিয়ে কোহিনূর ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং সেই যুক্তিতেই ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতার সময় এবং ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দেও বর্তমান রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেকের সময় কোহিনূর প্রত্যার্পণের দাবি তুলেছে ভারত। কিন্তু চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তা খারিজ করে দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। এরপর ২০০০, ২০১০ এবং ২০১৬ সালেও ভারত কোহিনূর ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ইউকে সরকারের কাছে গেলে তারা খারিজ করে দেয়। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন বলেছেন, ‘যদি কখনো বিট্রিশ মিউজিয়াম খালি করা লাগে তখনো বলব হীরাটি রেখে দাও।’ ২০১৩ সালে তিনি প্রায় একই কথা বলেন। ১৯৭৬ সালে পাকিস্তান হীরাটির মালিকানা দাবি করে। তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো, ইউকের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখে এই দাবি করেন। ২০০০ সালে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বলেন, ‘কোহিনূর মূলত এবং আইনত আফগানিস্তানের। তাই তিনি ইউকের কাছে কোহিনূর ফেরত চান। কিন্তু বিট্রিশ সরকার সে কথা আমলে নেননি।’
পাঁচ.
কোহিনূর নিয়ে প্রথম সিনেমা বানানো হয় ১৮৬৮ সালে উইল্কি কলিন্স’র উপন্যাস দ্য মুনস্টোন থেকে। এই উপন্যাসকে বলা হয় প্রথম ফুল-লেন্থ গোয়েন্দা উপন্যাস। কলিন্স বলেন, মুনস্টোন হচ্ছে দুটি হীরা নিয়ে লেখা, একটি হচ্ছে ওরলোভ-১৮৯.৬২ ক্যারেট(৩৭.৯ গ্রাম) এবং অন্যটি কোহিনূর। আগাথা ক্রিস্টিও ১৯২৫ সালে সিক্রেট অব চিমনিতে কোহিনূরকে নিয়ে আসেন। কাহিনিটা এমন যে, একটি দেশে হীরা লুকানো আছে, কেউ জানে না কোথায়? উপন্যাসের শেষে যখন জানতে পারবে তখন দেখা যাবে হীরাটা টাওয়ার অব লন্ডন থেকে চুরি করা হয়েছিল। একটি পারসিয়ান গ্যাং অন্য আরেকটা নকল হীরা রেখে কোহিনূর চুরি করেছিল।
এরকম আরো অনেক উপন্যাস ও সিনেমা হয়তো বানানো হয়েছে। বলিউড সিনেমায়ও কোহিনূরের নাম শোনা যায়। হৃতিক রোশানের ‘ব্যাং ব্যাং’ কোহিনূরকে কেন্দ্র করেই।
কোহিনূর হিরার ইতিহাস
........................................................................
“কোহ-ই-নূর” বা “কোহিনূর” নামটি শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যে দুস্কর সেটা আমার সাথে আপনারা সবাই একমত হবেন বলেই বিশ্বাস। এই একটি নামের সাথে যে কত ইতিহাস জড়িত তা আমাদের অনেকের অজানা। কোথা থেকে এসেছে, কিভাবে এসেছে, কার কার হাট দিয়ে এখনই বা কোথায় রয়েছে। এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর চলুন আজ যেনে নেই।
মুঘল সাম্রাজ্যের ২য় সম্রাট হুমায়ূন বহু দূর থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে প্রবেশ করেন তার পিতা সম্রাট বাবরের তাবুতে। এর পর পরম যত্নের সাথে পিতার হাতে তুলে দেন একটি হীরক পাথর। যে হীরকটি পাওয়া গিয়েছিল ভারতের গোলকুণ্ডার হীরার খনি থেকে। যে হীরাটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সে সময়ের এক রত্নাকর বলেছিলেন যে, সারা পৃথিবীর আধা বেলার খরচ নির্বাহ করা যাবে এ হীরার মূল্য দিয়ে। এই হীরক পাথরটির নামই হচ্ছে “কোহ-ই-নূর”।
মোঘল বাহিনীর হাতে পরাজিত হন গোয়ালিয়রের শাসক। সেই শাসকের মাতা অপেক্ষায় থাকেন ছেলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সুসম্পন্ন করার জন্য। কিন্তু তাঁর তাবুতে আক্রমন করেন ডাকাতের দল। ডাকাতের হাত থেকে তাদের উদ্ধার করেন শাহজাদা হুমায়ূন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সেই মহিলা হুমায়ুনের হাতে তুলে দেন কোহিনুর হীরা।
১০৫.৬ ক্যারেটের এই হীরার ইতিহাস কিন্তু বহু আগের। নানা ঘটনা জড়িত রয়েছে এর সাথে। কারো মতে এই হীরার বয়স ৫ হাজার বছর। কারো মতে কর্ণাটকের কোলার খনি থেকে কেউ বা বলে গোয়ালিয়রের খনি থেকে এসেছে কোহিনুর। হিন্দু মিথলোজিতে আছে এই হীরাটার কথা। চন্দ্র গুপ্ত মৌর্যের হাতেও এসেছিল এই হীরাটা এইরকম শোনা যায়। কিন্তু শক্ত কোনও ভিত্তি নেই এই কথাগুলোর।
যাই হোক ইতিহাসবিদদের মতে ১৩০৬ খ্রিষ্টাব্দে মালওয়ার শাসক কাকাতিয়া সাম্রাজ্যের শাসকের হাতে তুলে দেন কোহিনুর কে। কাকাতিয়া সাম্রাজ্যের হাত থেকে এই হীরা আসে দিল্লীর পাগলা সুলতান বলে খ্যাত মুহম্মদ বিন তুঘলকের হাতে সম্ভবত ১৩২৩ খ্রিষ্টাব্দে। পরে লোদী সাম্রাজ্যের শাসকরা এটার মালিক হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
সম্রাট বাবরের লিখিত বাবর নামাহর মতে গোয়ালিয়রের সেই নাম না জানা রাজপরিবারের হাত থেকে তারা কোহিনুর হীরাটি পান। প্রসঙ্গত সেই রাজপরিবার আর ইব্রাহিম লোদি এক সাথে লড়েছিলেন পানিপথের প্রথম যুদ্ধে। সম্রাট বাবরের হাত ধরে সেই হীরা আসে সম্রাট হুমায়ূনের হাতে। ইতিহাসবিদেররা বাবর নামা কে শক্তিশালী রেফারেন্স হিসেবে গন্য করেন।
আবার হাতবদলঃ
সম্রাট হুমায়ূন রাজ্যহারা। আশ্রয় নিয়েছেন পারস্যের অধিপতি শাহ তামাস্পের কাছে। কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে কিংবা উপহার বিনিময়ের রেওয়াজ হিসেবে পারস্যের সম্রাটের হাতে তুলে দেন এই মহামূল্যবান হীরাটি। পরবর্তীতে পারস্যের শাহর সহযোগিতায় দিল্লীর মনসদ ফিরে পান হুমায়ূন। কিন্তু মোঘল সম্রাটদের হাতছাড়া হয়ে যায় কোহিনূর। সম্রাট আকবর দ্য গ্রেট এবং তাঁর পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাম্রাজ্যের সময় এই হীরা তাদের কাছে ছিল না।
ফিরে আসা মুঘলদের কাছেঃ
পারস্যের শাহ আহমেদনগরের শাসক বুরহান নিজাম শাহ কে উপহার হিসেবে দেন কোহিনুর। মূলত নিজাম শাহ শিয়া ছিলেন বলেই এই উপহার দেওয়া। প্রায় ১০৯ বছর এই হীরা ছিল আহমেদনগরের নিজাম শাহ এবং গোলকুন্ডার কুতুব শাহ দের কাছে। পরে সুলতান আবদুলা কুতুব শাহের প্রধানমন্ত্রী মির জুমলা এই হীরা সম্রাট শাহজাহানের হাতে তুলে দেন। শাহজাহান এই হীরাটা কে বসান তাঁর বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসনে। সম্রাট শাহজাহান পর সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে ছিল এই হীরা। এই সময় কোহিনুরের স্থান ছিল মুঘল কোষাগারে। পরে মুহম্মদ শাহ রঙ্গিলার কাছে ছিল এই হীরাটা। ( উইকির মতে আওরঙ্গজেব তাঁর রাজধানী লাহোরে নিয়ে আসেন, কোহিনুর হীরার স্থান হয় তাঁর নিজ হাতে গড়া লাহোরের বাদশাহি মসজিদে)
অতঃপর হাত ছাড়াঃ
পারস্যের নাদির শাহ ভারত আক্রমন করে লুঠ করে নেন ময়ূর সিংহাসন সহ এই কোহিনুর হীরা। কিন্তু বেশিদিন ভাগ্যে সইল না তাঁর। আততায়ীদের হাতে খুন হয়ে যান নাদির শাহ। হীরা চলে যায় নাদির শাহ্র আফগান জেনারেল আহমেদ শাহ দুররানীর কাছে। নাদির শাহর লাশ দেখার সময় কায়দা করে তাঁর সিল টা আহত করের দুররানী এবং সেই সূত্রে মালিক হন কোহিনুরের। তাঁর মৃত্যুর পর হীরা আসে তাঁর সন্তান তিমুর শাহর কাছে। তিমুরের কাছ হতে জামান শাহর হাতে আসে সেখান থেকে সেখান হতে সুজা উল মূলকের কাছে। তিমুর শাহর ছোট সুজা উল মূলক তাঁর সৎ ভাই মাহমুদের কাছে পরাজিত হয়ে কাশ্মীরের গভর্নর আতা মুহাম্মদ খানের কাছে বন্দী হন ১৮১১ সালে। কিন্তু পাঞ্জাবের শিখ রাজা মহারাজ রঞ্জিত সিং সুজা কে উদ্ধার করেন এবং তাকে পরিবার সমেত লাহোরে পাঠিয়ে দেন। বদলে সুজা উল মূলক ১৮১৩ সালে রঞ্জিত সিং এর হাতে তুলে দেন কোহিনুর হীরা।
পাঞ্জাব থেকে ইংরেজদের হাতেঃ
রঞ্জিত সিং মারা গেলে হীরার মালিক হন তাঁর ১১ বছরের ছেলে মহারাজ দিলীপ। কিন্তু ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা দখল করে নেয় পাঞ্জাব আর বলা চলে দিলীপের হাত থেকে কেড়ে নেয় কোহিনুর হীরাটি। এইভাবে এই উপমহাদেশের কাছ হতে হাতছাড়া হয়ে যায় তাদের অন্যতম মহামূল্যবান সম্পদটি। লর্ড ডালহৌসি ১৮৫০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষ থেকে মহারানী ভিক্টোরিয়ার হাতে তুলে দেন হীরাটি। এই আনুষ্ঠিকতা সম্পন্ন করার জন্য তাঁরা দিলীপ কে নিয়ে যান লন্ডনে। সেই থেকে কোহিনুর শোভা পাচ্ছে রানীর মুকুটে। টাওয়ার অফ লন্ডনে দেখানোর জন্য মুকুটটি রয়েছে।
কোহিনূরের মূল্যঃ
১৯৩৭ সালে আরও ২৮০০ টি হীরার সাথে কোহিনূর হীরাটি ব্রিটিশ রাজ মুকুটে যুক্ত করা হয়। বর্তমানে লন্ডন টাওয়ারে জনসাধারণের সামনে প্রদর্শনীর জন্য অন্যান্য বিখ্যাত হীরা ও রত্ন পাথরের সাথে কোহিনূর হীরাটি রাখা আছে।
কোহিনূর হীরা কি মূল্য হতে পারে তার সঠিক কোন হিসেব দেওয়া আদও সম্ভব নয়। এর একটি বড় কারন হচ্ছে কোহিনূর হীরা তার জীবনে কখনো বিক্রি হয়নি। কখনো উপহার দেওয়া হয়েছে, কখনো বা কেও চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। তারপরেও আমরা কিছু ধারনার জন্য পাশাপাশি অন্য বিখ্যাত হীরার সাথে তুলনা করে দেখতে পারি মাত্র। গ্রাফপিংক হীরা (Graff Pink) যার ওজন ২৫ ক্যারেট এর কম, যা কোহিনূর হীরার ৪ ভাগের এ ভাগ। প্রায় ৬০ বছর আগে হংকং শহরে এ হীরাটি বিক্রি হয়েছিল ৪৬ মিলিয়ন ডলারে। ৫০ বছর পুরবেও কোহিনূর হীরার আনুমানিক মূল্য ২০০ মিলিয়ন ডলার ধারনা করা হচ্ছিল। যদিও ব্রিটিশ রাজ পরিবার কোহিনূর হীরার মূল্য ১০ থেকে ১২.৭০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছে। আর এ কোহিনূর এখন ২৮০০ হীরার একটু নাম। যার প্রকৃত পক্ষেই কোন মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
জায়ান্ট হান্টার একটি থ্রিলার বই
★★★★★
কবি এস.পি.সেবু সিলেট ::★★★
অহম রাজার গুপ্তধন যাহা ত্রিপুরা
রাজার তেলেসমতি আঙ্গুটির ভিতর
লুকায়িত নকশার
অালোকে বের করতে হবে। কয়েক
হাজার বছরের পুরানো ইতিহাস। এ যেন
রুপকথা নয় বাস্তব সাক্ষী। পৃথিবীর
প্রথম নারী শাষিত সিলেটের
জৈন্তিয়ার উষা রাণী ও উমা রাণীর
চুরি হওয়া কোহিনূর হীরার জমজ "
স্বর্গনূর " হীরকের সন্ধানে পাগল হয়ে
উঠেছে দক্ষিন এশিয়ার মাফিয়া
নেতা কেমোরা টেরাশর।
সন্ত্রাসীদদের বাধা দিতে মাঠে
নেমেছেন ইন্টারন্যাশনাল কাউন্টার
ইন্টিলিজেন্স ও বাংলাদেশের
একমাত্র বেসরকারী গোয়েন্দা ফার্ম
" অ্যাডভেঞ্জার ডিটেকটিভ ক্লাব
ADC চীপ এস. এম. শুভ চৌধুরী।
ঐ দিকে শুভ চৌধুরীর বাগদত্বা প্রিয়া
অহম বংশের সর্বশেষ রাজকুমারী
" সুনায়না ওয়ারী " কে জিম্ম করে
রেখে অাতংক সৃষ্টি করে পাগল হয়ে
উঠেছে এক ইংরেজ ভিলেন। তার ইচ্ছা
একহাজার বছরের পুরানো স্বর্ণ
প্লেটে খুদাইকরা সিলেটী নাগরী
ভাষায় রচিত ৭ খন্ড পুঁথি হস্তগত করা।
এ যেন অসম্ভবকে সম্ভব করার অলীক
চেষ্টা। যে ধাঁধা সমাধান করতে
পরেনি কেউ দশহাজার বছরে তা শুভ
চৌধুরির জন্য মাত্র ১১ দিন বেঁধে
দিয়েছে ডক্টর ডেভিল।
পাঠক, চলুন আমাদের সাথে নৌকা
চালাই অারকান প্রদেশে , ঘোড়া
ছোটাই রাঙ্গামাটি থেকে অাইজলের
রাস্তায়। ভোলা এন্ডা ফাইটে জড়িয়ে
পড়ি ইন্ডিয়ান BSF এর সাথে , বাধ্য হয়ে চুরি
করি অাগরতলার মূখ্যমন্ত্রীর গাড়ি,
দুইশত মাইল বেগে গাড়ি দৌড়াই
মণিপুর রাজ্যের ইম্ফলে , হারিয়ে যাই
কোহিমার ভূগর্ভস্থ প্রাচীন সুড়ঙ্গে,
হাইজ্যাক করি ইটানগর থেকে চায়না
ড্রোন বিমান, অথবা জড়িয়ে পড়ি
মরণপন যুদ্ধে শিলং - গোহাটির
রাস্তায়, শিলচরে ভয়ংকর ১১ টি
কারবাইন মোকাবেলা করতে হবে।
নিষ্ঠুর দুই শত্রু পিছু নেবে অাপনার।
পদে পদে থাকবে মৃত্যুর হাতছানি।
কিন্তু ভয় নেই আমাদের সাথে চলুন
একসময় সব বাধা বিপত্তি ঠেলে
করিমগঞ্জের গোপন টানেলিং দিয়ে ভারত বাংলার বর্ডার বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে
ঠিকই পৌছে যাবেন সিলেটের জৈন্তিয়া রাজবাড়ির অন্ধকূপে। স্বর্গনূর হীরক আপনার হাতেই।
না বন্ধুগন কল্পনা নয় দম বন্ধ হওয়া উক্তেজনা আর রক্ত গরম করা অ্যাকশন
বুদ্ধির মার প্যাঁচ এক অভিযান।
(বইটির ২য় অধ্যায়ে অাছে আরো ভয়ংকর কাহিনী) যার ট্রেলার হলো :
নিউ ইস্কাটন প্লাজার ১১ বিতে প্রবেশ করতেই কুচকুচে
কালো ভয়ংকর মিনি কারবাইনের স্পর্শে মাথাটা ঝিম করে উঠলো SIB জেনারেল চীপ অফ স্পাই শুভ চৌধুরির।
র্দুর্ধর্ষ, দুদান্ত, ও দুঃসাহসী
SIB এর এই স্পাইয়ের ২৯ বছর জীবনে এই প্রথম শীতল স্রোত শরীরে বয়ে গেলো।
পেছন থেকে হো হো হো অট্রহাসিতে ঘম ঘম করে উঠলো অাজিজ সামিরার দক্ষিন হস্ত কেজিবি এজেন্ট
ডক্তর ডেভিলের পরিচিত কন্ঠ।
পৃথিবীর ঝানু ঝানু গোয়েন্দাদের সন্ধানী চোখ ফাঁকি দিয়ে মাফিয়া আজিজ সামিরা গংরা চলচ্চিত্রের মহানায়ক সালমান শাহর পরিকল্পিত হত্যাকে আত্বহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার হীন পায়তারাকে ভেটো দিয়ে গর্জে উঠলেন এক নামকরা অান্তর্জাতিক প্রাইভেট ডিটেকটিভ।
কে এই ডিটেকটিভ ?
কি তার স্বার্থ ?
বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টিলিজেন্সের বস মাসুদ রানা এজেন্সির রিক্টুিংয়ে -
সাইমুম ক্রিসেন্ট ফোর্সের
তত্বাবধানে ও হিমালয় টিটির আর্শিবাদ শ্লেডারে " অপারেশন মহাকাল " নামে SIB টিম
জীবন মৃত্যুর চেলেঞ্জে " সালমান খুনিদের " এনকাউন্ডারের জন্য জড়িয়ে পড়েছে ঢাকা - চট্রগ্রামের জাতীয় সড়কে সংঘর্ষে.........!!!
এদিকে খুনিচক্রের ফাঁসির রায় অাদালতে ঘোষনার দিন থাইল্যান্ড থেকে হুমকী !!!
কে এই ভদ্রবেশী লেডি কিলার ? অগ্যাতনামা সুন্দরী নারী ? যে প্রতিমাসে নতুন নতুন কুমার ছেলেদের ডেরায় ডেকে যৌবনের লোভ দেখিয়ে রক্ত চোঁষে নেয় হরদম ? অজানা হাজারো ইতিহাস ??
ভয় করছে ? না না ভয় নয় বন্ধুগন । অাসুন একঘেয়ামীর
জীবন গন্ডি পেরিয়ে যোগ দিন SIB টিমে । অারেকটি রহস্য অপারেশন । সত্যিই হারিয়ে যাবেন অাচানক এক মায়াবী জগতে........!!!!!!!
★★★
তাহলে কী ভারতের অরুনাচলের ইটানগরে চায়না ড্রোন বিমান হাইজ্যাকের সময়
ডক্তর ডেভিল মারা যান নি ?
একটার পর একটা খুন, গুম,অপহরণ, তার সাথে
বাংলা সিনেমার বহু নায়ক নায়িকার অকালে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কার হাত?
কেজিবি, মোসাদ,সিনবেথ,রেড ড্রাগন, কেমোরা, কোসানোষ্টা, ব্লাক অার্মি, ঈগল নাকি তামিল টাইগার ??? অন্যদিকে বিচ্ছিনতাবাদীদের থ্রেথের গোলকধাঁধায় জিম্মি SIB শুভ চৌধুরী..... বিস্তারিত জানতে বইটি পড়ুন.....
জানতে হলে অবশ্যই পড়ুন : জায়ান্ট হান্টার বইটি।।
(বি.দ্র: বইটির লেখক - কবি এস.পি.সেবু - কেন্দ্রীয় সভাপতি : স্বপ্নবাংলা পরিষদ)
৬ ঘন্টা ১৬ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ৪ মিনিট আগে
৭ দিন ১১ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে
৯ দিন ৩ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
৯ দিন ৬ ঘন্টা ৩৪ মিনিট আগে
৯ দিন ৬ ঘন্টা ৪৮ মিনিট আগে
৯ দিন ৬ ঘন্টা ৪৯ মিনিট আগে
১১ দিন ৩ ঘন্টা ৫৭ মিনিট আগে