মানবতার পাখি....
-
নাজিয়া ইসলাম
আমি নীলিমা। আমি ক্লাস ৯ম শ্রেণিতে পড়ি। আমার নীল আকাশ অনেক প্রিয়। তাই হয়তো আমার নাম নীলিমা। পাখির মতো উড়তে ইচ্ছে করে আমার। যাই হোক, আমি যেহেতু এবার ৯ম শ্রেণিতে পড়ি তো আমার পড়াশোনার অনেক চাপ। সকাল ছয়টায় পদার্থবিজ্ঞান প্রাইভেট। প্রতিদিনের মতো আজও আমি তাড়াতাড়ি তৈরি হলাম। বাবা নয় মা যেকোনো একজন আমাকে রোজ দিয়ে আসে। আজ বাবা নিয়ে যাচ্ছে। রাস্তা ফাঁকা, গাছের পাখিগুলো ডাঁকছে। আমার সকাল বেলা খুবই ভালো লাগে। এদিকে ঘড়ির দিকে তাঁকিয়ে দেখি ছয়টা বেজে গেছে। প্রাইভেট রুমে ঢুকে দেখলাম সবাই উপস্থিত। কিছু বান্ধবী আমাকে দেখে বত্রিশটা দাঁত বের করে হাসলো। এর কারণ আমি একটু দেরি করে ফেলেছি। স্যার পড়াচ্ছেন প্রত্যেকটি ক্রিয়ার একটা সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। অর্থ্যাৎ নিউটনের তৃতীয় সূত্র। আমরা সবাই মনযোগ দিয়ে স্যারের কথাগুলো শুনছিলাম। মাঝখানে আমার এক বান্ধবী খুবই অসুস্থ ছিল।
সে স্যারের কাছে ছুটি চায়। স্যার ওকে ছুটি দেয় এবং বলল-‘তুমি কি একা যেতে পারবে? মেয়েটির নাম সায়রা। স্যারের কথা শোনার পর সায়রা না বোধক উত্তর দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। আমরা সবাই অনেক ভয় পেয়ে যাই। স্যারের মনে হয় রীতিমতো পেসার হাই হয়ে গিয়েছিল। স্যার প্রচুর ভয় পেয়েছিল। ঠিক তখনই কিছু বান্ধবী মম, মাইশা, বিভা, মৌমি, কাশফিয়া, রিয়া সবাই ওকে তাড়াতাড়ি ধরলো। পাশেই রিয়ার থাকার মেস। পরে সবাই ধারধরি করে রিয়ার মেসের বেডে সায়রাকে শুয়ে দিলাম। এদিকে সেই মম সায়রার মাথায় পানি ঢালছে। রিয়া, বিভা, মাইশা, মৌমি ওর হাত-পা মালিশ করতে লাগলো। কিন্তু সায়রার জ্ঞান আসছিল না। আমরা খুবই চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমাদের মাঝ থেকে অনেকেই আবার আমাদের রেখে চলে গেয়েছিল। আমি আরও লক্ষ্য করলাম, বেশ কিছু মেধাবী ছাত্রী মানবতার কাছে হেরে গিয়ে তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থের দিকে মনোনিবেশ হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। যাই হোক, আমাদের মাথায় তখন ঘুরছিলো কি করা যায়? ওকে হাসপাতালে নিবো কি? প্রায় ২০মিনিট হয়ে গেছে সায়রার কোনো জ্ঞান আসার সম্ভাবনাই দেখলাম না। তারপর সত্যিই আমাদের জোরালো সিদ্ধান্ত হলো আমরা ওকে হাসপাতাল-এ নিয়ে যাবো। এদিকে সায়রার যেনো কোনো সমস্যা না হয় তার জন্য রুমটা ফাঁকা করলাম।
এদিকে মমর পানি ঢালা শেষ। সে সায়রার মাথায় তেল মালিশ করে দিল। সেদিন আমি মমকে দেখে মগ্ধ হয়েছিলাম। এদিকে কিছুদিন ধরে মম আর মাইশার ঠিক আগের মতো বন্ধুত্ব নেই। তারা এখন আর একসাথে ঘুরে না, কথা বলে না। আমরা অনেকেই বলেছিলাম আবার মিলে যা তোরা। কিন্তু
তারা নাছোড়বান্ধা। তারা আর মিল হবে না। দুজনেরই সাফ সাফ উত্তর। এদিকে বিভা স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী স্যালাইন বানালো। কিন্তু তা সায়রাকে খাওয়ানো যাচ্ছিলো না। সায়রার অবস্থার অবনতি হচ্ছিলো। ঠিক তখনই আমার এক প্রিয় স্যার আসলেন। আমরা স্যারকে বললাম-স্যার, ওকে এখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি। স্যারের আমাদের বললেন আচ্ছা, একটি রিকশা নিয়ে আসতে হবে।’ স্যারের কথা বলা শেষ হওয়ার আগেই আমি আর কাশফিয়া দৌঁড়। আমরা রিকশাওয়ালা মামাকে তার রিকশা নিয়ে আসতে বলালাম। তারপর স্যারদের সহযোগিতায় আমরা সবাই ওকে ধরে রিকশায় উঠালাম। যেহেতু সকাল বেলা রিকশার সংখ্যা খুবই কম ছিলো। একটাই পেয়েছিলাম। যার কারণে সায়রাকে নিয়ে শুধু বিভা, মৌমি ও কাশফিয়া যেতে পেরেছিল। এদিকে আমার হাত-পা রীতিমতো কাঁপছিলো। আমি মমর হাত শক্ত করে ধরে রিকশার ভেতরে চলে যাওয়া সায়রাকে দেখছিলাম। যতক্ষণ দেখা যাবে ততক্ষণই দেখব। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে ওর জন্য দোয়া করলাম। আমি মমর দিকে তাকিয়েছিলাম। কি অদ্ভুত এক প্রতিভা আমি ওর চোখে দেখেছিলাম। মমরও হাত-পা কাঁপছিলো। চোখটা সেই মায়াবী পাখির মতো হয়ে গেছে। হঠাৎ লক্ষ করলাম ওর চোখের পানির শিশির বিন্দু।
এদিকে মাইশাও তখন প্রচুর ভয় পেয়েছিল। ঠিক তখনই মম মাইশাকে বলল,‘সায়রা যেনো ঠিক হয়ে যায়।’ আমি ওদের একে অপরের সাথে কথা বলতে দেখে খুবই খুশি হলাম। তখন তিনজন কাঁধে কাঁধ রেখে যাচ্ছিলো আর মনে মনে ভাবছিলাম মানবতার পাখিগুলো বাড়ি ফিরছে। কিন্তু‘বাড়ির ফেরার পর আমি ভেবেছিলাম যে, এতো দেরিতে ফিরলাম, হয়তো বাড়ির সবাই আমাকে অনেক বোকা দিবে। কেননা, আমি কোনো দিনও বাড়িতে দেরিতে ফিরি না। বাবাকে নরম কন্ঠে ও একটু ভয় নিয়ে বললাম-বাবা, তুমি কি চিন্তা করছিলে? বাবা কিছু উত্তর দিল না। শুধু মুচকি হাসি দিলো পরে বাবাবে সবকিছু খুলে বলালম। মা ও বাবা আমাকে ও আমার সকল বান্ধবীদের অভিনন্দন জানালো আর বললো
‘আমরা যেনো সবসময় মানুষের পাশে থাকি।’ তারা আরও বলেলন-শুধু পড়াশোনা দিয়ে কিছু করা যায় না। পড়াশোনার পাশাপাশি মানবিক হতে হয়।’ তারপর আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, আমার মা-বাবাও পাশে আছে। এদিকে স্কুলে যেতে হবে বলে তাড়াতাড়ি তৈরি হলাম। কিন্তু সেই সায়ার কথা মনে হতে লাগলো। ভাবলাম ওর কি জ্ঞান ফিরেছে? কিছু কি খেয়েছে? এই ভেবে আমার সকালের খাওয়াটা ভালো হলো না। পরে স্যারের মাধ্যমে জানতে পারলাম। স্যার আমাকে বললেন-আম্মু চিন্তা করো না।
সায়রার জ্ঞান ফিরেছে। সে ভালো আছে।” এ কথা শুনে আমি খুশিতে লাঁফ দিলাম। এখন আমাদের বান্ধবী আবার আমাদের সাথে খেলা করে। সে এখন ভালো আছে। আসলে পৃথিবীতে ভোগও যেমন করা যায়, ঠিক তেমনি ত্যাগও করা যায়। কিন্তু সব ভোগে যেমন তৃপ্তি নেই ঠিক তারই বিপরীতে ত্যাগেই তৃপ্তি লাভ করা যায়। সত্যিই এই মিশনে এই মানবতার পাখিগুলোর সাথে নিজেকে শরিক করতে পেয়ে ধন্য মনে করছি। তোরা ভালো থাক। তোরা এগিয়ে যাবি অনেকদূরে। মানবতার পাখিগুলো ভালো থাকুক। ভালো থাকুক আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী।
অভিজ্ঞাতার আলোকে..
নাম-নাজিয়া ইসলাম
পিতা-মো. নজরুল ইসলাম, সিনিয়র শিক্ষক
মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়
নবম শ্রেণি, বিজ্ঞান বিভাগ
উপজেলা-মধুপুর, জেলা-টাঙ্গাইল।
৪ ঘন্টা ৫৪ মিনিট আগে
১ দিন ৯ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে
৪ দিন ২ ঘন্টা ৪২ মিনিট আগে
৭ দিন ১৭ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে
৮ দিন ১৪ ঘন্টা ২৪ মিনিট আগে
৮ দিন ১৪ ঘন্টা ২৮ মিনিট আগে
১৪ দিন ৮ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে
১৯ দিন ১৪ ঘন্টা ৯ মিনিট আগে