◾ নিউজ ডেস্ক
ভয়াবহ খরার কবলে এখন ইউরোপ মহাদেশ। এ খরা এতটাই তীব্র যে সেটিকে সম্ভবত গত ৫০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। ইউরোপ মহাদেশের ৪৭ শতাংশ এলাকা ‘সতর্কতা’ অবস্থায় রয়েছে, যার অর্থ সেখানকার মাটি শুকিয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের যে অভিঘাত, ইউরোপের খরা অন্য দেশগুলোর জন্যও একটি সতর্কবার্তা। বিশেষ করে নদীমাতৃক বাংলাদেশও সেই হুমকির মধ্যে রয়েছে। কারণ ভারতের কাছ থেকে পানির যে হিস্যা, তা সঠিকভাবে না পেলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের অনেক নদী শুকিয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সেই পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশ কি পাবে?
অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এক দীর্ঘমেয়াদি অমীমাংসিত ইস্যু। দুই দেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে একমাত্র গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি স্বাক্ষর হলেও তিস্তাসহ আলোচনায় থাকা ৮টি নদীর পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে এখনও কোনো সুরাহা হয়নি। গঙ্গা চুক্তির পর আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগির ব্যাপারটি। ২০১১ সালে দুই দেশের মধ্যে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে সব প্রস্তুতি নেওয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতায় তা সম্পন্ন করা যায়নি। এর অন্তত এক যুগ পর গত বৃহস্পতিবার দিল্লিতে দুই দেশের ৩৮তম যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং ভারতের পক্ষে জলশক্তিমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং সেখাওয়াত। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক, সচিব কবির বিন আনোয়ার এবং ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব পঙ্কজ কুমার।
বৈঠকে গঙ্গা, তিস্তা, মনু, মুহুরি, খোয়াই, গুমতি, ধরলা, দুধকুমার ও কুশিয়ারা নদীর পানি নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, আরও কয়েকটি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন-সংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির জন্য নদীর তথ্য-উপাত্ত আদান-প্রদান করা হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তা পানিচুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। এর জবাবে ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রচেষ্টা থাকবে বলে আশ্বস্ত করা হয়। কুশিয়ারা নদীর পানি উত্তোলনের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধের জবাবে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি তাদের সক্রিয় বিবেচনাধীন আছে।
এই বৈঠক আসলে দুই দেশের পানি ভাগাভাগির একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ৫ সেপ্টেম্বর প্রায় তিন বছর পর ভারতে যাচ্ছেন। দিল্লিতে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পানি ভাগাভাগি নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক চুক্তি (এমওইউ) হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে। তবে এবারও আলোচনায় রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে। তার বিরোধিতার কারণেই সেবার তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এবার প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরের আগে ঢাকা একান্তভাবে চাইছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দিল্লিতে যেন শেখ হাসিনার সাক্ষাৎ হয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত আন্তঃসীমান্ত নদী বা অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি। জেআরসির একজন বিশেষজ্ঞ, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা এ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চুক্তির মাধ্যমেই একটি দেশের পানির হিস্যা প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয়।
তিনি বলেছেন, ছয়টি নদী ভারতের যে রাজ্যগুলোর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সেই রাজ্যগুলোর সরকারও যেন আলোচনা বা চুক্তির প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকে, সেটা এখন বাংলাদেশ চাইছে। তিস্তার পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে একটি চুক্তি নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা হয়েছিল। পরে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে তা এগোতে পারেনি। বাংলাদেশ তাই রাজ্যগুলোর অংশগ্রহণ চাইছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এই ছয়টি নদী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মালিক ফিদা এ খান আরও জানিয়েছেন, এবারের বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে ফেনী নদীর পানিপ্রাপ্তির যে সমঝোতা হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের ব্যাপারে। ভারতের ত্রিপুরার সাবরুম শহরে পানির সংকট মোকাবিলায় ১ দশমিক ৮২ কিউসেক পানি উত্তোলনের ব্যাপারে ২০১৯ সালে সমঝোতা হয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাতে সম্মতি দিয়েছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কুশিয়ারা নদীতে একটি সেচ প্রকল্পের জন্য ১৫৩ কিউসেক পানি উত্তোলনের জন্য খাল সংযোগের ব্যাপারে ভারতকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার তাগাদা দেওয়া হয়েছিল।
◾ পানিবণ্টনে জটিলতা কোথায় :
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুই দেশের পানিবণ্টনের মীমাংসা শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়। এক্ষেত্রে ভারতের রাজ্য সরকারের স্বার্থ এবং সম্মতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিরও এখানে প্রভাব রয়েছে। তারা বলেছেন, বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ে যে ধরনের সংলাপ বা আলোচনার প্রয়োজন, সেটি যথাসময়ে করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া সব পক্ষের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা যায়নি। যে কারণে অভিন্ন নদীর পানি-সংক্রান্ত ছোটখাটো বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকতে দেখা যায়।
জেআরসির বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ মালিক ফিদা এ খান বলেন, ‘সংলাপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটাই সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু আলোচনায় যদি আমরা সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে আসতে না পারি, তাহলে দেখা যায় যে সবসময় সমাধানটা একদম সঠিক সময়ে হয় না।’ তিনি মনে করেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখে এর সমাধান সম্ভব। তার বক্তব্য, ‘দুই দেশই আমাদের পানির দক্ষ ব্যবহার করতে পারি। আমরা দুই দেশে অববাহিকাভিত্তিক সামগ্রিকভাবে নদীব্যবস্থাপনাকে যদি চিন্তা করি, তাহলে দেখা যাবে এরকম অনিশ্চয়তা এবং দুশ্চিন্তা আমরা দূর করতে পারব।’
তবে এ সংকট সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, এক যুগ পর জেআরসি বৈঠকের ফলে ভারতের সঙ্গে পানি আলোচনার বরফ গলেছে। এ বৈঠকের ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং সেখাওয়াতের ভূয়সী প্রশংসা করে জাহিদ ফারুক বলেন, তিনি (গজেন্দ্র সিং) খুব কর্মঠ ও আন্তরিক মানুষ। আমি তাকে আগামী মার্চ কিংবা এপ্রিলে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তখন জেআরসি পরবর্তী বৈঠক করবে। হেলিকপ্টারে করে পুরো বাংলাদেশ দেখাব, কীভাবে আমাদের জীবনের সঙ্গে পানির সম্পর্ক।
প্রতিমন্ত্রী জাহিদ বলেন, গঙ্গার পানির সবচেয়ে ভালো ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন নিয়ে কোনো কথা বলিনি। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে অনেক সময় বাকি আছে। তার আগে বাংলাদেশে ভোট হবে। ভোটের পরে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করা যাবে।
তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করতে আমরা ভারতীয় পক্ষকে বলেছি। তারা চেষ্টা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। তবে তিস্তার ব্যাপারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে। কুশিয়ারা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কুশিয়ারা থেকে ১৫৩ কিউসেক পানি বাংলাদেশ উত্তোলন করতে পারবে। চুক্তির খসড়া ভারতের মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হলে প্রধানমন্ত্রীর সফরে সই হতে পারে।
১২ ঘন্টা ০ মিনিট আগে
১২ ঘন্টা ১ মিনিট আগে
১২ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
১২ ঘন্টা ১৪ মিনিট আগে
১ দিন ৪২ মিনিট আগে
১ দিন ৪৫ মিনিট আগে
১ দিন ১ ঘন্টা ৪০ মিনিট আগে
১ দিন ২ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে