◾ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চীনের অর্থনীতির গতি এখন মন্থর। করোনা নিয়ন্ত্রণে ‘শূন্য-কোভিড নীতি’ কার্যকর করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি। আর এই শূন্য কোভিড নীতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানো রীতিমতো কঠিন হয়ে উঠেছে দেশটির জন্য। এর ফলে বৈশ্বিক বাজার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দিতে পারছে না চীন।
আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের নিয়ন্ত্রণ একচেটিয়া না হলেও দেশটির তৈরি পণ্য বিশ্ববাজারের বড় অংশ দখল করে আছে। আর রপ্তানিনির্ভর পণ্য হচ্ছে চীনের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
করোনার কারণে চীনে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের গতি ধীর হয়ে পড়েছে, এটিকে মূলত দেশটির অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রধান কারণ বলা যেতে পারে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতির দেশটির ওপর করোনা বেশ বড়সড় আঘাত হেনেছে।
বেইজিংয়ের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫ শতাংশ নির্ধারিত, এখন সেটি নাগালের বাইরে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিসংখ্যান আগামী সপ্তাহে পাওয়া যাবে। এরপরই চীনের অর্থনৈতিক গতি কতটা মন্থর, তা জানা যাবে।
যদিও চলতি অর্থবছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সংকোচন এড়াতে পেরেছে চীন। তারপরও এ বছর কোনো প্রবৃদ্ধিই আশা করছেন না অর্থনীতিবিদরা।
চীনকে হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করতে হবে না। তবে দেশটিকে অন্যান্য সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে, কারণ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির গ্রাহক এরই মধ্যে কমে গেছে। এ ছাড়া চীনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য বৃহৎ অর্থনীতির দেশের মধ্যে বিরাজমান বাণিজ্যিক যুদ্ধ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের মান কমেছে। কোনো দেশের মুদ্রার অবস্থান আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল হলে বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। ফলে বিনিয়োগ কমার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে আরও অর্থের জোগান দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তোলা কঠিন।
এসব এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেসে (সিপিসি) ক্ষমতায় থাকার তৃতীয় মেয়াদ নিশ্চিত করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে যাওয়ার কারণগুলো
◾শূন্য কোভিড নীতির প্রভাব—
শূন্য কোভিড নীতি চীনের অর্থনৈতিক মন্দার প্রধান কারণ বলে বিবেচনায় এসেছে। শেনজেন ও তিয়ানজিনের মতো উৎপাদনশীল অঞ্চলগুলোতে করোনার প্রাদুর্ভাব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আঘাত হেনেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে দেশটি।
অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিশ্বব্যাপী মানুষ শুধু খাদ্যদ্রব্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ব্যয় করছে। ফলে পর্যটনের মতো বড় খাতগুলো চাপের মধ্যে পড়েছে।
ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস অনুসারে সেপ্টেম্বরে কারখানার উৎপাদন আবারও বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে সরকার অবকাঠামো উন্নয়নে বেশি ব্যয় করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে একটি বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, কারখানার উৎপাদন মূলত সেপ্টেম্বরে হ্রাস পেয়েছে। উৎপাদন হ্রাসের কারণ হিসেবে চাহিদা হ্রাস পাওয়া, নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার, মুদ্রাস্ফীতি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ থেকে ক্রেতার সংখ্যাও কমে গেছে।
যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতিকে চাঙা করতে বেইজিং অনেক পদক্ষেপই নিতে পারে। তবে করোনা শূন্যে নামিয়ে না আনা পর্যন্ত তেমন কোনো পরিকল্পনা করছে না চীন।
◾উদ্যোগের অভাব—
ছোট ছোট ব্যবসা, অবকাঠামো ও রিয়েল এস্টেট খাতের ব্যবসাগুলোকে উৎসাহিত করতে গত আগস্টে ২০৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে চীন। তবে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অবকাঠামো উন্নয়নে আরও বেশি ব্যয় করতে পারত। সেই সঙ্গে বাড়িঘর ক্রয়, ডেভেলপার কোম্পানি ও স্থানীয় সরকারকে আরও সহজ শর্তে ঋণ দিতে পারত। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
◾সংকটপূর্ণ সম্পত্তি বাজার—
আবাসন ও হাউজিং খাতে দুর্বল কার্যক্রম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর করেছে। এটি চীনের অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত হেনেছে। কারণ, চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) এক-তৃতীয়াংশ আসে সম্পত্তি এবং অন্যান্য শিল্প খাত থেকে।
রিয়েল এস্টেট বাজারকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বেইজিংয়ের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অনেক শহরে বাড়ির দাম এই বছর ২০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রিয়েল এস্টেট বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষকে আরও অনেক কিছু করতে হবে।
◾জলবায়ুর প্রভাব—
বৈরী আবহাওয়া চীনের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। আগস্টে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ সিচুয়ান ও চংকিং শহরে তীব্র খরার কারণে অত্যধিক তাপদাহ দেখা দেয়, ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাহিদা বাড়াতে শুরু করে। সেই সঙ্গে বাড়ে বিদ্যুতের চাহিদা। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ফক্সকন ও টেসলার মতো বড় বড় নির্মাণ কারখানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
চীনের পরিসংখ্যান ব্যুরো জানায়, এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসে স্টিল ও আয়রন শিল্পে লভ্যাংশ গত বছরের তুলানায় ৮০ শতাংশ কমেছে। এ অবস্থা কাটাতে বেইজিং অবশেষে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে ১০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে।
◾প্রযুক্তি বাজারে বিনোয়োগ কমে যাওয়া—
দুই বছর ধরে চীনের প্রযুক্তি বাজারের ওপর কঠোর ব্যবস্থা আরোপ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। টেকসেন্ট ও আলিবাবার মতো প্রযুক্তি বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব কমতে শুরু করেছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই তিন মাসে টেকসেন্টের লভ্যাংশ কমেছে ৫০ শতাংশ। আর এ বছর আলিবাবার নিট আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং তার ক্ষমতা ব্যবহার করছেন কিছু বেসরকারি কোম্পানির ওপর। কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলো সুবিধা ভোগ করছে। ফলে বিদেশিরা তাদের বিনিয়োগ বন্ধ করে দিচ্ছেন।
এদিকে, বৈদ্যুতিক যান নির্মাতা বিওয়াইডির কাছে ওয়ারেন বাফেটের বার্কশায়ার হ্যাথওয়ে তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিলে জাপানের সফটব্যাংক আলিবাবা তাদের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ তুলে নেয়। শুধু এই বছরের দ্বিতীয়ার্ধেই টেনসেন্ট ৭ বিলিয়ন বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছে।
সেই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের শেয়ারবাজারে চীনা কোম্পানির নাম তালিকাভুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। এটির প্রভাবও পড়েছে চীনের অর্থনীতিতে।
১ দিন ৪ ঘন্টা ৩ মিনিট আগে
১ দিন ২২ ঘন্টা ৩৫ মিনিট আগে
২ দিন ১৬ ঘন্টা ১৫ মিনিট আগে
৫ দিন ৪ ঘন্টা ২১ মিনিট আগে
৬ দিন ৩ ঘন্টা ৪৫ মিনিট আগে
৭ দিন ১ ঘন্টা ৫১ মিনিট আগে
৭ দিন ১ ঘন্টা ৫৩ মিনিট আগে
৭ দিন ১ ঘন্টা ৫৯ মিনিট আগে