কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে দীপান্বিতা কালীপুজো খুবই ধুমধাম করে পালন করা হয়। যে কোনও পুজো ঘিরেই বহু গল্প প্রচলিত থাকে। তেমনই রয়েছে কালীকে ঘিরেও। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর আদেশ পাওয়ার পরই পুজো শুরু হয় সর্বত্র। কেউ শ্মশান কালী, কেউ ডাকাত কালী আবার কেউ শ্যামা মা হিসেবেই পরিচিত। আদ্যাপীঠ হোক কিংবা ত্রিপুরেশ্বরী সকলে পুজো পান কালী হিসেবেই। তবে বেশিরভাগ মন্দিরেই যে কালীমূর্তি আমরা দেখি তা কিন্তু দক্ষিণাকালীর। দেবী দুর্গা থেকে কালীর উৎপত্তি – দেবী মহাত্ম্যম নামক গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে মহিষাসুরদের বধ করার সময় দেবী দুর্গার ক্রোধে তাঁর তৃতীয় নয়ন থেকে কালো রঙের আগুন বের হয়। সেই আগুন থেকেই ক্রুদ্ধ কালো কালীর উৎপত্তি হয়।তখন মা কালী অসুরদের বিনাশ করেন।এট অমরত্ব অসুর রক্তবীজ,যার রক্ত মাটিতে পড়ায় সাথে সাথে সেই রক্ত থেকে নতুন অসুরের জন্ম হয়।মা কালী,ছিন্নমস্তা কালী রুপ ধারণ করে রক্তবীজের মুণ্ডকাটেন, তাঁর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই সেই রক্ত মা কালী পান করে নেন।এই ভাবে তিনি রক্তবীজ অসুরকে বধ করেন। মা কালীর বিভিন্ন রূপের মধ্যে অন্যতম এক রূপ হলো শ্যামা কালী । এই রূপে পূজা করার প্রচলন সবচেয়ে বেশি ।শ্যামা কালী পূজার ইতিহাস বহু প্রাচীন, পুরান ও তন্ত্র সাহিত্যে তার উল্লেখ আছে। তিনি ভগবান শিবের স্ত্রী দূর্গার আর এক রূপ কালী।এই রূপে তিনি অসুরদের বিনাশ করেন। সনাতন ধর্মের তিনি তান্ত্রিক দেবী, যিনি শক্তির প্রতীক, তিনি মহামায়া, তিনি সৃষ্টির উৎস আবার সমস্ত কিছু ধ্বংসের দেবী। তাঁকে তুষ্ট করিলে সকল বাঁধা, দুঃখ এবং কষ্ট দূর হবে। দেবী কালীর সাধারণত দেহের রঙ কৃষ্ণবর্ণে হয় আবার নীল রঙের হয়,চারটি হাত এক হাতে অস্ত আর এক হাতে অসুরের কাটা মুণ্ড তাহার গলায় অসুরদের কাটা মুণ্ডমালা এবং কোমরে অসুরদের কাটা হাতের কোমরবন্ধ থাকে। এলোকেশী ,জিভ বের করা, মুখমন্ডল উন্মুক্ত এবং পদতলে দেবাদিদেব মহাদেব, দুই পাশে দাঁড়িয়ে ডাকিনী ও যোগিনী ।হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব শ্যামা কালী পূজা বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত হবে।। উদযাপিত হবে শ্যামা পূজা ও দীপাবলী উৎসব। দুর্গাপূজার বিজয়া পরবর্তী কার্তিক মাসের অমবস্যা তিথিতে সাধারণত শ্যামা পূজা বা কালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। অমাবস্যার রাতেই দীপাবলীর আয়োজন করা হয়। অমাবস্যার সমস্ত অন্ধকার দূর করতে এই রাতে প্রদীপ জ্বালানো হয় যাতে পৃথিবী প্রতিনিয়ত অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা পায়। দেবী সৃষ্টিরক্ষায় মাতৃরূপে গৃহে গৃহে অবস্থান করেন। আবার অসুর বধে দেবী মাতংগিনীরূপে সব ধ্বংস করেন। সৃষ্টির রক্ষায় দেবতারা যখন ব্যর্থ, তখন বৈষ্ণব শক্তি শিব শবরূপে (মৃতদেহ) দেবীর আগমনপথে পড়ে রইলেন। মুন্ড-মালিনী উন্মাদিনী তার ডাকিনী-যোগিনী সংগে রণাঙ্গিনী বেশে ছুটে যাচ্ছেন। পায়ের নিচে শবরূপে (মৃত) পতি শিবকে দেখে দেবী লজ্জিত হয়ে জিভে কামড় দেন। যে দেবী রক্তপিপাসায় নিজের মস্তক কেটে ছিন্নমন্ডারূপে রক্তপান করছিলেন সেই দেবী লজ্জায় রণে ক্ষান্ত হলেন। লজ্জাই নারীর ভূষণ- এ সত্যই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।হিন্দু পূরাণমতে- কালী দেবী দুর্গারই একটি শক্তি। সংস্কৃত ভাষার ‘কাল’ শব্দ থেকে এ কালি নামের উৎপত্তি। তবে সাধারণত ‘কাল’ অর্থ নির্ধারিত সময়। আবার এটি ‘মৃত্যু’ অর্থও প্রকাশ করে। এর সঙ্গে ‘কালো’র সম্পর্ক না থাকলেও লৌকিকভাবে এ অর্থটি প্রচলিত হয়ে গেছে। মহাভারত অনুসারে, কালী দুর্গার একটি রূপ (মহাভারত, ৪।১৯৫)। এছাড়া মহাভারতে উল্লেখ আছে, যিনি নিহত যোদ্ধা ও পশুদের আত্মাকে বহন করেন, তাঁর নাম কালরাত্রি বা কালী। মহাভারতের ভীষ্মপর্বে পা-বদের বিজয় লাভের আঙ্কাাখায় কালীপূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কালী’ নামটি উচ্চারিত হয়েছে অথর্ব বেদের ‘কথাগ্রহসূত্র’ ও ‘মু-কউপনিষদে’। তবে অনেকে মনে করে তিনি একান্তই সাঁওতালি দেবী। তাকে শিবের স্ত্রী পার্বতীরূপেও দেখা হয়। কালীর অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যশক্তি। শাক্ত ধর্মাবলম্বীদের তন্ত্রশাস্ত্র মতে, তিনি দশমহাবিদ্যা। তন্ত্রমতে পূজিত প্রধান দশজন দেবীর মধ্যে প্রথম। ভক্তরা কালীকে বিশ্বব্রহ্মা- সৃষ্টির আদিকারণ মনে করেন। বাংলাদেশে কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। কালী পূজা হচ্ছে শক্তির পূজা। জগতের সকল অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে শুভশক্তির বিজয়ের মধ্যেই রয়েছে কালীপূজার মাহাত্ম্য। কালী দেবী তার ভক্তদের কাছে শ্যামা, আদ্য মা, তারা মা, চিামুন্ডি, ভদ্রকালী, মহাকালী, শ্মশান কালী, দক্ষিণা কালী, দেবী মহামায়াসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত।আজ বৃহসাপতিবার সন্ধ্যায় হিন্দু সম্প্রদায় তাদের বাড়িতে ও শ্মশানে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করবে। এর মাধ্যমে অর্থাৎ জ্ঞানের অবস্থান এবং স্বর্গীয় পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজনদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা কালীমাতার কাছে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনের কল্যাণ এবং দেশ ও জাতির সমৃদ্ধি কামনায় প্রার্থনা করে থাকে। দীপাবলীকে দিওয়ালী ছাড়াও দীপান্বিতা, দীপালিকা, সুখরাত্রি, সুখসুপ্তিকা এবং যক্ষরাত্রি নামেও অভিহিত হয়। মহালয়ায় শ্রাদ্ধগ্রহণের জন্য যমলোক ছেড়ে যে পিতৃপুরুষগণ মর্তে আগমন করেন বলে, তাঁদের পথ প্রদর্শনার্থে উল্কা জ্বালানো হয়। এ কারণে এদিন আলোকসজ্জা ও বাজি পোড়ানো হয়। কেউ কেউ রাত্রিতে নিজগৃহে দরজা-জানালায় মোতবাতি জ্বালায়, কেউ বা লম্বা বাঁশের মাথায় কাগজের তৈরি ছোট ঘরে প্রদীপ জ্বালায়। রামায়ন অনুসারে দীপাবলী দিনে ত্রেতা যুগে শ্রী রাম রাবণ বধ করে চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন করেন। শ্রী রামের চৌদ্দ বছর পরের প্রত্যাবর্তনে সারা রাজ্যজুড়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। প্রজারা খুশীতে শব্দবাজি করে। বিষ্ণুপুরান মতে, বিষ্ণুর বামন অবতার অসুর বলিকে পাতালে পাঠান, দীপাবলী দিনে পৃথিবীতে এসে অন্ধকার ও অজ্ঞতা বিদূরিত করতে, ভালবাসা ও জ্ঞানের শিখা প্রজ্বলিত করতে অসুর বলিকে পৃথিবীতে এসে অযুদ প্রদীপ জ্বালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। লাকনাথ বসু তার ‘হিন্দুধর্ম মর্ম’ নামক বইয়ে পঞ্চ-মকার সম্পর্কে বলেছেন যে, মদ্য বলতে পানীয় মদ বোঝায় না, তা ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে ক্ষরিত অমৃতধারা বা ব্রহ্মানন্দ; মাংস মানে দেহের মাংস নয়, তা হলো জিভের সংযম; মৎস্য বলতে মাছ বোঝায় না, তা হলো শ্বাসনিরোধ (প্রাণায়াম); মুদ্রা মানে টাকা-পয়সা নয়, বরং আত্মাতে যে পরমাত্মা মুদ্রিত হয়ে আছেন, সেই তত্ত্বজ্ঞান এবং মৈথুন বলতে যৌনসংগম বোঝায় না, তা হলো জীবাত্মাতে পরমাত্মার বিরাজ। কালীপূজাই বলি কিংবা অন্য যে পূজাই বলি না কেন, এসব পূজা ও দেবদেবীর আখ্যানের মূলে রয়েছে, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির লড়াই বা বিকাশ। সেই দিক থেকে ধর্ম পালন বা সবাইকে নিয়ে অশুভের বিরুদ্ধে লড়াই তা কিন্তু নিরন্তর চলছেই।অনুষ্ঠান সূচিতে রয়েছে আজ ব্রাহ্মমুহূর্তে মায়ের আবাহন, বাল্য ভোগ, মায়ের পূজা ও ভোগরাগ, প্রসাদ বিতরণ, শ্যামা সংগীত ও ভক্তিমূলক গান, ধর্মীয় আলোচনা সভা, প্রদীপ প্রজ্জ্বল্রন।, চন্ডীপাঠ ও রাত ১২টায় শ্রী শ্রী শ্যামা মায়ের মহাপূজা। (সচ্চিদানন্দদেসদয়,সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী)
১ ঘন্টা ৫২ মিনিট আগে
১ ঘন্টা ৫৪ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ১০ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ২৫ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ২৬ মিনিট আগে
২ ঘন্টা ৫৫ মিনিট আগে
৩ ঘন্টা ৩৭ মিনিট আগে
৪ ঘন্টা ৪১ মিনিট আগে