গণতন্ত্রের চার স্তম্ভের একটি হলো গণমাধ্যম। রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে বলা হয় ‘চতুর্থ স্তম্ভ’। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে স্তম্ভ নিজেই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, অনিরাপদ ও অনিশ্চিত, সে কীভাবে রাষ্ট্র ও সমাজকে শক্ত ভিত দিতে পারে?
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বাস্তবতা আজ এই প্রশ্নটিকে ক্রমেই জরুরি করে তুলছে।
১. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-censorship)
একজন সাংবাদিক যখন জানেন যে তার বেতন অনিয়মিত, চাকরি নিরাপদ নয় বা প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে—তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই কিছু বিষয় এড়িয়ে চলেন। ক্ষমতাবান ব্যক্তি, বড় বিজ্ঞাপনদাতা বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশ করার সাহস কমে যায়। এর ফল হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ, যা গণতন্ত্রের জন্য নীরব কিন্তু ভয়ংকর হুমকি।
২. বিজ্ঞাপননির্ভরতা ও সংবাদে পক্ষপাত
বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া হাউস পুরোপুরি বিজ্ঞাপননির্ভর। এই বিজ্ঞাপন আসে মূলত বড় ব্যবসায়ী, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল থেকে। ফলে সংবাদ নির্বাচন ও উপস্থাপনায় প্রভাব পড়ে। যে সংবাদে বিজ্ঞাপন ঝুঁকিতে পড়ে, সেটি গুরুত্ব পায় না—এভাবেই সত্য ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।
৩. মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকতার দুর্বলতা
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক সাংবাদিকই বেতন পান না বা নামমাত্র পান। পরিচয়ই তাদের মূল পুঁজি। ফলে তারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের মুখোমুখি হতে ভয় পান। দুর্নীতি, ভূমিদস্যুতা, প্রশাসনিক অনিয়ম—এসব বিষয় চাপা পড়ে যায়। অথচ গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্ত হয় স্থানীয় স্তরেই।
৪. পেশাগত নৈতিকতার অবক্ষয়
অর্থনৈতিক সংকট সাংবাদিকদের নৈতিক চাপে ফেলে। কেউ কেউ বাধ্য হন সংবাদ নয়, ‘সুবিধা’কে অগ্রাধিকার দিতে। সব সাংবাদিক নন, কিন্তু কয়েকজনের অনৈতিক আচরণ পুরো পেশার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করে। জনগণ তখন মিডিয়ার ওপর আস্থা হারায়, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতি।
৫. শক্তিশালী সাংবাদিকতা ছাড়া সচেতন নাগরিক সম্ভব নয়
গণতন্ত্র টিকে থাকে সচেতন নাগরিকের ওপর। আর নাগরিক সচেতন হয় নির্ভরযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে। সাংবাদিকতা দুর্বল হলে তথ্য বিকৃত হয়, অর্ধসত্য ছড়ায়, গুজব শক্তিশালী হয়। এতে জনগণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারায়।
উপসংহার
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশার সংকট নয়—এটি সরাসরি গণতন্ত্রের সংকট। সাংবাদিকের কলম শক্ত করতে হলে আগে তার জীবনকে নিরাপদ করতে হবে। ন্যূনতম বেতন কাঠামো, টেকসই মিডিয়া ব্যবসা মডেল ও পাঠকনির্ভর সংবাদব্যবস্থা ছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়।
গণতন্ত্র রক্ষা করতে হলে আমাদের প্রথমে সেই আয়নাটিকেই শক্ত করতে হবে, যেখানে রাষ্ট্র নিজের চেহারা দেখে—গণমাধ্যম।
৬ ঘন্টা ৫ মিনিট আগে
১০ ঘন্টা ৩৮ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ৩২ মিনিট আগে
১১ ঘন্টা ৩৬ মিনিট আগে
১২ ঘন্টা ৬ মিনিট আগে
১২ ঘন্টা ১৭ মিনিট আগে